‘কুফরি কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাস’ খাটিয়ে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর মামলায় এক অভিনব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। প্রতারণা মামলার মূল আসামি বড় বোনের হয়ে আদালতে ‘প্রক্সি’ দিয়ে কারাগারে যাওয়ার অভিযোগে ছোট বোন ভাবনাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
সোমবার ঢাকার
মহানগর হাকিম কামাল উদ্দীন এই রিমান্ডের আদেশ দেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী কাইয়ুম হোসেন
নয়ন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, রিমান্ডে যাওয়া ওই নারীর আসল নাম ভাবনা।
আদালত সূত্রে
জানা যায়, গত মঙ্গলবার বড় বোন শারমিন আক্তার একার সেজে ছোট বোন ভাবনা আদালতে আত্মসমর্পণ
করে কারাগারে যান। তবে গত বৃহস্পতিবার এই আসামির রিমান্ড শুনানিকালে বাদীপক্ষ সন্দেহ
প্রকাশ করে দাবি করে, কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী আসল আসামি একা নন, তিনি অন্য কেউ। এই তথ্যের
ভিত্তিতে বিচারক ওই নারীকে মুখের হিজাব ও মাস্ক সরাতে বলেন। এরপর আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র
(এনআইডি) এবং পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর চেহারার কোনো মিল পাওয়া
যায়নি।
আদালতের নির্দেশে
আটক নারী আসলেই শারমিন আক্তার একা কি না, তা যাচাইয়ের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন
করেছিলেন উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম। গতকাল সোমবার আসামিকে কারাগার থেকে
বিশেষ নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়।
শুনানিকালে
আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন রিমান্ডের বিরোধিতা করে নাটকীয়ভাবে সত্য স্বীকার
করেন। আদালতে জামিন প্রার্থনা করে তিনি বলেন, ‘তিনি শারমিন আক্তার একা না, ভাবনা। তিনি
মামলার আসামি না। বোনের হয়ে প্রক্সি দিয়েছেন, প্রমাণ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভিন্ন মামলা
হবে। যেহেতু আসামি নয়, ভুল স্বীকার করেছি। তার অব্যাহতি চাচ্ছি।’
অন্যদিকে,
বাদীপক্ষের আইনজীবী রকিবুল ইসলাম ও কাইয়ুম হোসেন নয়ন রিমান্ডের পক্ষে জোর যুক্তি তুলে
ধরে বলেন, এই জালিয়াতির পেছনে বড় কোনো চক্র কাজ করছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক
ভাবনার সত্যতা যাচাই, এনআইডি, পাসপোর্ট ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট গ্রহণের জন্য ৩ দিনের রিমান্ড
মঞ্জুর করেন।
এই ঘটনার
নেপথ্যে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর ও অবিশ্বাস্য প্রতারণার গল্প। প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন
দেখিয়ে, ‘কুফরি-কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাসের’ মাধ্যমে হিপনোটাইজ করে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর
কাছ থেকে ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ১৪-১৬ কোটি টাকার জমি আত্মসাতের অভিযোগে উত্তরা পূর্ব
থানায় ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আজিজুল আলম।
মামলার এজাহারে
আজিজুল আলম অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান নামের
এক ব্যক্তি তার কাছে আসে এবং তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চায়। পরে
মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানায়, প্রাচীন ম্যাগনেটিক
পিলার বিদেশে বিক্রি করে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ টাকা আনা হবে, যার অর্ধেক আজিজুলকে দেওয়া
হবে।
এজাহারে বাদী
আরও বলেন, ‘সোহেলের সুন্নতি লেবাস ও চটকদার কথাবার্তায় আজিজুল বিশ্বাস অর্জন করেন।
এরপর থেকে তার কারসাজি শুরু হয়। বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শয়তানের
নিঃশ্বাস ব্যবহার করে হিপনোটাইজ করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তারা কোটি কোটি
টাকা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে। তাদের কাছে অলৌকিক ও জ্বিনের
মাধ্যমে মূল্যবান প্রাচীন পিলার ম্যাগনেট এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আসতে
পারে বলে জানায়। এরপর তারা তার অফিসে মাঝে মধ্যে যাতায়াত শুরু করে এবং তাকে বিভিন্ন
ধরনের খাবার ও মিষ্টি খাওয়ায়। খাবার খাওয়ার পর থেকে তার মাথায় কাজ করছিল না। আজিজুল
তাদের অনুগত হয়ে যান। তারা যা বলে তারা তাই করে।’
প্রতারণার
এই জাল এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন পর ‘জিনের মা’ সেজে এক নারী বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন
দিয়ে টাকা দাবি করতে থাকে। এরপর ‘জিনের বাদশা’ পরিচয় দিয়ে রাসেল নামের একজন ফোন করে
হুমকি দেয়।
এজাহারে বাদী
উল্লেখ করেন, ‘পরবর্তীতে জ্বিনের বাদশা (রাসেল) তাকে ফোন করে বলে সোহেল ও নাজমুলকে
পাঠিয়েছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা দিয়ে দে। যদি না দিস তাহলে তোর ক্ষতি হবে। এভাবে
২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সময় ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা প্রতারণা করে নিয়ে
নেয়।’ এছাড়া ভয় দেখিয়ে উত্তরখান এলাকার ১৪-১৬ কোটি টাকা মূল্যের ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমিও
লিখে নেয় এই চক্র।
এই জালিয়াতির
ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর বড় বোন একার পক্ষে ওকালতনামা সই করা আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিবের
ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আদালত। ওই আইনজীবী রোববার আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা
চেয়ে মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আবেদন করেন। রিমান্ড শুনানিকালে বিচারক তীব্র অসন্তোষ
প্রকাশ করে বলেন, ‘ওই আইনজীবীর লাইসেন্স বাতিল করা দরকার।’ মামলার মূল আসামি শারমিন
আক্তার একা সহ বাকি প্রতারকদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
‘কুফরি কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাস’ খাটিয়ে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর মামলায় এক অভিনব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। প্রতারণা মামলার মূল আসামি বড় বোনের হয়ে আদালতে ‘প্রক্সি’ দিয়ে কারাগারে যাওয়ার অভিযোগে ছোট বোন ভাবনাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
সোমবার ঢাকার
মহানগর হাকিম কামাল উদ্দীন এই রিমান্ডের আদেশ দেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী কাইয়ুম হোসেন
নয়ন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, রিমান্ডে যাওয়া ওই নারীর আসল নাম ভাবনা।
আদালত সূত্রে
জানা যায়, গত মঙ্গলবার বড় বোন শারমিন আক্তার একার সেজে ছোট বোন ভাবনা আদালতে আত্মসমর্পণ
করে কারাগারে যান। তবে গত বৃহস্পতিবার এই আসামির রিমান্ড শুনানিকালে বাদীপক্ষ সন্দেহ
প্রকাশ করে দাবি করে, কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী আসল আসামি একা নন, তিনি অন্য কেউ। এই তথ্যের
ভিত্তিতে বিচারক ওই নারীকে মুখের হিজাব ও মাস্ক সরাতে বলেন। এরপর আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র
(এনআইডি) এবং পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর চেহারার কোনো মিল পাওয়া
যায়নি।
আদালতের নির্দেশে
আটক নারী আসলেই শারমিন আক্তার একা কি না, তা যাচাইয়ের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন
করেছিলেন উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম। গতকাল সোমবার আসামিকে কারাগার থেকে
বিশেষ নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়।
শুনানিকালে
আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন রিমান্ডের বিরোধিতা করে নাটকীয়ভাবে সত্য স্বীকার
করেন। আদালতে জামিন প্রার্থনা করে তিনি বলেন, ‘তিনি শারমিন আক্তার একা না, ভাবনা। তিনি
মামলার আসামি না। বোনের হয়ে প্রক্সি দিয়েছেন, প্রমাণ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভিন্ন মামলা
হবে। যেহেতু আসামি নয়, ভুল স্বীকার করেছি। তার অব্যাহতি চাচ্ছি।’
অন্যদিকে,
বাদীপক্ষের আইনজীবী রকিবুল ইসলাম ও কাইয়ুম হোসেন নয়ন রিমান্ডের পক্ষে জোর যুক্তি তুলে
ধরে বলেন, এই জালিয়াতির পেছনে বড় কোনো চক্র কাজ করছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক
ভাবনার সত্যতা যাচাই, এনআইডি, পাসপোর্ট ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট গ্রহণের জন্য ৩ দিনের রিমান্ড
মঞ্জুর করেন।
এই ঘটনার
নেপথ্যে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর ও অবিশ্বাস্য প্রতারণার গল্প। প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন
দেখিয়ে, ‘কুফরি-কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাসের’ মাধ্যমে হিপনোটাইজ করে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর
কাছ থেকে ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ১৪-১৬ কোটি টাকার জমি আত্মসাতের অভিযোগে উত্তরা পূর্ব
থানায় ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আজিজুল আলম।
মামলার এজাহারে
আজিজুল আলম অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান নামের
এক ব্যক্তি তার কাছে আসে এবং তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চায়। পরে
মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানায়, প্রাচীন ম্যাগনেটিক
পিলার বিদেশে বিক্রি করে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ টাকা আনা হবে, যার অর্ধেক আজিজুলকে দেওয়া
হবে।
এজাহারে বাদী
আরও বলেন, ‘সোহেলের সুন্নতি লেবাস ও চটকদার কথাবার্তায় আজিজুল বিশ্বাস অর্জন করেন।
এরপর থেকে তার কারসাজি শুরু হয়। বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শয়তানের
নিঃশ্বাস ব্যবহার করে হিপনোটাইজ করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তারা কোটি কোটি
টাকা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে। তাদের কাছে অলৌকিক ও জ্বিনের
মাধ্যমে মূল্যবান প্রাচীন পিলার ম্যাগনেট এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আসতে
পারে বলে জানায়। এরপর তারা তার অফিসে মাঝে মধ্যে যাতায়াত শুরু করে এবং তাকে বিভিন্ন
ধরনের খাবার ও মিষ্টি খাওয়ায়। খাবার খাওয়ার পর থেকে তার মাথায় কাজ করছিল না। আজিজুল
তাদের অনুগত হয়ে যান। তারা যা বলে তারা তাই করে।’
প্রতারণার
এই জাল এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন পর ‘জিনের মা’ সেজে এক নারী বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন
দিয়ে টাকা দাবি করতে থাকে। এরপর ‘জিনের বাদশা’ পরিচয় দিয়ে রাসেল নামের একজন ফোন করে
হুমকি দেয়।
এজাহারে বাদী
উল্লেখ করেন, ‘পরবর্তীতে জ্বিনের বাদশা (রাসেল) তাকে ফোন করে বলে সোহেল ও নাজমুলকে
পাঠিয়েছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা দিয়ে দে। যদি না দিস তাহলে তোর ক্ষতি হবে। এভাবে
২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সময় ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা প্রতারণা করে নিয়ে
নেয়।’ এছাড়া ভয় দেখিয়ে উত্তরখান এলাকার ১৪-১৬ কোটি টাকা মূল্যের ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমিও
লিখে নেয় এই চক্র।
এই জালিয়াতির
ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর বড় বোন একার পক্ষে ওকালতনামা সই করা আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিবের
ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আদালত। ওই আইনজীবী রোববার আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা
চেয়ে মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আবেদন করেন। রিমান্ড শুনানিকালে বিচারক তীব্র অসন্তোষ
প্রকাশ করে বলেন, ‘ওই আইনজীবীর লাইসেন্স বাতিল করা দরকার।’ মামলার মূল আসামি শারমিন
আক্তার একা সহ বাকি প্রতারকদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

আপনার মতামত লিখুন