পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দিকে। মাঠের লড়াই শুরু হতে বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। কিন্তু বল মাঠে গড়ানোর আগেই এক অশুভ বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন জলবায়ু গবেষক ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা।
তাদের দাবি, এবারের বিশ্বকাপ কেবল গোলের রেকর্ডই ভাঙবে না, বরং পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রেও তৈরি করবে এক কালো ইতিহাস। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই টুর্নামেন্টটি আদতে একটি ‘কার্বন বোমা’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, যা জলবায়ু সংকটকে ঠেলে দেবে আরও ভয়াবহতার দিকে ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরিবেশ গবেষণা সংস্থা ‘সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপনসিবিলিটি’র যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ৯০ লাখ টন (৯ মিলিয়ন টন) কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হতে পারে। এটি একটি চমকে দেওয়ার মতো সংখ্যা। এই পরিমাণ প্রায় ৬৫ লাখ সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ি এক বছর ধরে অবিরাম চালালে যে পরিমাণ ধোঁয়া নির্গত হয়, তার সমান!
বিগত চারটি বিশ্বকাপের গড় দূষণের প্রায় দ্বিগুণ এই পরিমাণ। মজার ব্যাপার হলো, ফিফা কর্তৃক ইস্যুকৃত টেকসই পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও এই নিঃসরণের মাত্রা কাতার বিশ্বকাপের (৫.২৫ মিলিয়ন টন) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হবে ।
কেন এই অভূতপূর্ব দূষণ? বিজ্ঞানীরা ফিফার কয়েকটি সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন: প্রথমত, দলের সংখ্যা বৃদ্ধি। ফিফা এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করেছে। এর ফলে ম্যাচের সংখ্যাও ৬৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১০৪-এ। টুর্নামেন্ট যত বড় হচ্ছে, পরিবেশের ওপর চাপ তত বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের বিপরীতে, যেখানে সব স্টেডিয়াম রাজধানী ঢাকার মতো কাছাকাছি ছিল, এবারের আসর ছড়িয়ে আছে পুরো উত্তর আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার ১৬টি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো ।
গবেষণায় দেখা গেছে, টুর্নামেন্টের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৮৫ শতাংশই (প্রায় ৭৭ লাখ টন) আসবে বিমান ভ্রমণ থেকে। ভক্ত ও খেলোয়াড়দের এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে হবে। যেমন, মিয়ামি থেকে ভ্যাঙ্কুভারের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার!
শুধু কার্বন নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের খেসারত এবার মাঠেই দিতে হবে ফুটবলার ও দর্শকদের। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, টুর্নামেন্টের ২৬টি ম্যাচ (মোটের এক-চতুর্থাংশ) চরম তাপমাত্রার সম্মুখীন হবে ।
ডালাস, হিউস্টন, মিয়ামির মতো শহরগুলোতে তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ফুটবলারদের জন্য ‘বাতিলের পর্যায়ের’ গরম । বিশেষ করে আটলান্টা, কানসাস সিটি ও ফিলাডেলফিয়ার মতো মাঠে খেলোয়াড়দের হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়ছে।
অতিরিক্ত গরমের কারণে স্টেডিয়ামগুলোর দানবীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, যা পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করবে এবং তৈরি করবে একটি ‘বিষাক্ত চক্র’। মজার ব্যাপার হলো, তিনটি মাঠে (ডালাস, হিউস্টন ও আটলান্টা) এয়ার কন্ডিশনার থাকলেও, বাকি মাঠগুলোতে খোলা পরিবেশে এই তাপদাহ সহ্য করতে হবে ফুটবলার ও দর্শকদের ।
ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের কার্বন নিঃসরণ অর্ধেক করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। পরিবেশবিদদের অভিযোগ, ফিফা বড় বড় কর্পোরেট স্পনসরশিপের লোভে পরিবেশের বিষয়টি উপেক্ষা করছে।
২০২৪ সালে ফিফা যে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে চার বছরের জন্য চুক্তি করেছে, সেই কোম্পানিটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি । ফিফা যেখানে টেকসই উন্নয়নের গল্প বলছে, সেখানে এই স্পনসরশিপকে বিজ্ঞানীরা ‘গ্রিনওয়াশিং’ (লোক দেখানো পরিবেশবান্ধবতা) বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
ফুটবলের এই মহোৎসব যখন শুরু হবে, তখন মাঠের জাদুতে হয়তো মেতে উঠবে বিশ্ব। কিন্তু তার আড়ালে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে বিষাক্ত কার্বনের ক্ষত তৈরি হবে, সেই গোলপোস্টের খেসারত দিতে হবে পুরো মানবজাতিকে।
পরিবেশবিদদের মতে, ফিফাকে এখনই টুর্নামেন্টের আকাশ ভ্রমণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে । শেষ পর্যন্ত আমাদের ভালোবাসার খেলাটি যেন আমাদের গ্রহের জন্য অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়টি এখনই ভাবনার সময়।

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দিকে। মাঠের লড়াই শুরু হতে বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। কিন্তু বল মাঠে গড়ানোর আগেই এক অশুভ বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন জলবায়ু গবেষক ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা।
তাদের দাবি, এবারের বিশ্বকাপ কেবল গোলের রেকর্ডই ভাঙবে না, বরং পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রেও তৈরি করবে এক কালো ইতিহাস। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই টুর্নামেন্টটি আদতে একটি ‘কার্বন বোমা’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, যা জলবায়ু সংকটকে ঠেলে দেবে আরও ভয়াবহতার দিকে ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরিবেশ গবেষণা সংস্থা ‘সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপনসিবিলিটি’র যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ৯০ লাখ টন (৯ মিলিয়ন টন) কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হতে পারে। এটি একটি চমকে দেওয়ার মতো সংখ্যা। এই পরিমাণ প্রায় ৬৫ লাখ সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ি এক বছর ধরে অবিরাম চালালে যে পরিমাণ ধোঁয়া নির্গত হয়, তার সমান!
বিগত চারটি বিশ্বকাপের গড় দূষণের প্রায় দ্বিগুণ এই পরিমাণ। মজার ব্যাপার হলো, ফিফা কর্তৃক ইস্যুকৃত টেকসই পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও এই নিঃসরণের মাত্রা কাতার বিশ্বকাপের (৫.২৫ মিলিয়ন টন) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হবে ।
কেন এই অভূতপূর্ব দূষণ? বিজ্ঞানীরা ফিফার কয়েকটি সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন: প্রথমত, দলের সংখ্যা বৃদ্ধি। ফিফা এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করেছে। এর ফলে ম্যাচের সংখ্যাও ৬৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১০৪-এ। টুর্নামেন্ট যত বড় হচ্ছে, পরিবেশের ওপর চাপ তত বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের বিপরীতে, যেখানে সব স্টেডিয়াম রাজধানী ঢাকার মতো কাছাকাছি ছিল, এবারের আসর ছড়িয়ে আছে পুরো উত্তর আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার ১৬টি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো ।
গবেষণায় দেখা গেছে, টুর্নামেন্টের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৮৫ শতাংশই (প্রায় ৭৭ লাখ টন) আসবে বিমান ভ্রমণ থেকে। ভক্ত ও খেলোয়াড়দের এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে হবে। যেমন, মিয়ামি থেকে ভ্যাঙ্কুভারের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার!
শুধু কার্বন নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের খেসারত এবার মাঠেই দিতে হবে ফুটবলার ও দর্শকদের। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, টুর্নামেন্টের ২৬টি ম্যাচ (মোটের এক-চতুর্থাংশ) চরম তাপমাত্রার সম্মুখীন হবে ।
ডালাস, হিউস্টন, মিয়ামির মতো শহরগুলোতে তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ফুটবলারদের জন্য ‘বাতিলের পর্যায়ের’ গরম । বিশেষ করে আটলান্টা, কানসাস সিটি ও ফিলাডেলফিয়ার মতো মাঠে খেলোয়াড়দের হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়ছে।
অতিরিক্ত গরমের কারণে স্টেডিয়ামগুলোর দানবীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, যা পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করবে এবং তৈরি করবে একটি ‘বিষাক্ত চক্র’। মজার ব্যাপার হলো, তিনটি মাঠে (ডালাস, হিউস্টন ও আটলান্টা) এয়ার কন্ডিশনার থাকলেও, বাকি মাঠগুলোতে খোলা পরিবেশে এই তাপদাহ সহ্য করতে হবে ফুটবলার ও দর্শকদের ।
ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের কার্বন নিঃসরণ অর্ধেক করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। পরিবেশবিদদের অভিযোগ, ফিফা বড় বড় কর্পোরেট স্পনসরশিপের লোভে পরিবেশের বিষয়টি উপেক্ষা করছে।
২০২৪ সালে ফিফা যে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে চার বছরের জন্য চুক্তি করেছে, সেই কোম্পানিটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি । ফিফা যেখানে টেকসই উন্নয়নের গল্প বলছে, সেখানে এই স্পনসরশিপকে বিজ্ঞানীরা ‘গ্রিনওয়াশিং’ (লোক দেখানো পরিবেশবান্ধবতা) বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
ফুটবলের এই মহোৎসব যখন শুরু হবে, তখন মাঠের জাদুতে হয়তো মেতে উঠবে বিশ্ব। কিন্তু তার আড়ালে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে বিষাক্ত কার্বনের ক্ষত তৈরি হবে, সেই গোলপোস্টের খেসারত দিতে হবে পুরো মানবজাতিকে।
পরিবেশবিদদের মতে, ফিফাকে এখনই টুর্নামেন্টের আকাশ ভ্রমণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে । শেষ পর্যন্ত আমাদের ভালোবাসার খেলাটি যেন আমাদের গ্রহের জন্য অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়টি এখনই ভাবনার সময়।

আপনার মতামত লিখুন