যশোরের চৌগাছায় গ্রেপ্তারের পর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের আদালতে এই মামলার সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ঘটনার অন্যতম ভুক্তভোগী এবং চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি মো. ইসরাফিল হোসেন।
এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মো. আব্দুস সাত্তার পালোয়ান। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ওমর ফারুক, জহিরুল আমিন, শাইখ মাহাদী ও উদয়।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সেদিনের লোমহর্ষক বর্ণনায় কান্নায় ভেঙে পড়েন ২৯ বছর বয়সী ইসরাফিল হোসেন। নিজের কেটে ফেলা বাম পা ট্রাইব্যুনালকে দেখিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন তিনি।
জবানবন্দিতে ইসরাফিল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে পুলিশ আমাকে অনেকদিন ধরেই খুঁজছিল। ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট বিকেলে আমি ও আমার বন্ধু চৌগাছা থানা শিবিরের সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিন মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় চৌগাছা থানার পুলিশ আমাদের আটক করে। এসআই মোকলেস, এএসআই মাজেদ ও এএসআই সিরাজুল ইসলামসহ অন্যরা আমাদের তল্লাশি করে কয়েকটি দলীয় বই পায়।’
থানায় নিয়ে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘রাত ১১টার পর আমাদের ওসি মশিউর রহমানের রুমে নিয়ে চর, থাপ্পড়, কিল-ঘুষি ও বুট দিয়ে লাথি মারা হয়।" সাক্ষী জানান, ওই রাতেই এসআই আকিকুল ওসিকে বলেন, 'স্যার এদের ব্রেন ওয়াশ করা, এরা কিছু বলবে না। এদেরকে গুলি করে দেন।' পরদিন সন্ধ্যায় ডিবি অফিস থেকে তাদের চোখ ও হাত বেঁধে চৌগাছার বন্দলীতলা মাঠের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়।
গুলি করার মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে ইসরাফিল বলেন, “সেখানে আমরা গুলির শব্দ পাই। তখন একজন বলে ওঠে ‘ফায়ার অফ’। কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারি তিনি ওসি মশিউর। এর অল্প কিছুক্ষণ পর ওসি মশিউর বললেন, ‘সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার’। সাথে সাথে বিকট শব্দ হয় এবং আমার বন্ধু রুহুল আমিন মাগো বলে চিৎকার করে ওঠে। এর অল্প কিছুক্ষণ পর আমি আমার বাম পায়ের হাঁটুতে বন্দুকের স্পর্শ পাই এবং বিকট শব্দে আমার পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়।”
এ সময় ট্রাইব্যুনালে অঝোরে কাঁদতে থাকেন সাক্ষী ইসরাফিল। তিনি বলেন, ‘পড়ে যাওয়ার পর পুলিশ আমার হাতের হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেয়। তারা কিছু ধুলাবালি আমার ক্ষতস্থানে মেখে তা গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়। পঙ্গু হাসপাতালে ১৫ দিন চিকিৎসার পর পায়ে পচন ধরে যায়। ফলে আমার বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়।’
ইসরাফিল আদালতকে জানান, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই পুরো ঘটনার জন্য তিনি তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমানসহ জড়িত আট পুলিশের শাস্তি দাবি করেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ইসরাফিল হোসেনকে জেরা করেন গ্রেপ্তারকৃত আসামি এসআই আকিকুল ইসলামের আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন। জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, পুলিশ তাদের ব্যাগ তল্লাশি করে অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য পেয়েছিল। জবাবে সাক্ষী বলেন, "ইহা সত্য নয়।"
আইনজীবী আরও প্রশ্ন করেন যে, শিবির নেতারা পুলিশের প্রতি হাতবোমা নিক্ষেপ করেছিল এবং তাতে পুলিশ সদস্য আহত হয়েছিল কি না। এর জবাবে সাবেক এই শিবির নেতা বলেন, ‘ইহা সত্য নয় যে, আমরা পুলিশের প্রতি হাতবোমা নিক্ষেপ করেছি, যাতে পুলিশ সদস্য জহিরুল হক ও সিরাজুল আহত হয়েছেন। কনস্টেবল সিরাজ ও জহিরুলকে আমাদের সাথে পুলিশ ভ্যানে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে- এই কথাও সত্য নয়।’
এদিন শুনানির সময় গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামি- চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হককে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার অন্য পাঁচ আসামি- তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
গত ২০ এপ্রিল এই আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমানকে এবং তারও আগে এসআই আকিকুল ইসলামকে এই মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আগামী ২৫ জুন দিন ধার্য করেছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আব্দুস সাত্তার পালোয়ান।

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
যশোরের চৌগাছায় গ্রেপ্তারের পর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের আদালতে এই মামলার সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ঘটনার অন্যতম ভুক্তভোগী এবং চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি মো. ইসরাফিল হোসেন।
এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মো. আব্দুস সাত্তার পালোয়ান। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ওমর ফারুক, জহিরুল আমিন, শাইখ মাহাদী ও উদয়।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সেদিনের লোমহর্ষক বর্ণনায় কান্নায় ভেঙে পড়েন ২৯ বছর বয়সী ইসরাফিল হোসেন। নিজের কেটে ফেলা বাম পা ট্রাইব্যুনালকে দেখিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন তিনি।
জবানবন্দিতে ইসরাফিল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে পুলিশ আমাকে অনেকদিন ধরেই খুঁজছিল। ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট বিকেলে আমি ও আমার বন্ধু চৌগাছা থানা শিবিরের সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিন মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় চৌগাছা থানার পুলিশ আমাদের আটক করে। এসআই মোকলেস, এএসআই মাজেদ ও এএসআই সিরাজুল ইসলামসহ অন্যরা আমাদের তল্লাশি করে কয়েকটি দলীয় বই পায়।’
থানায় নিয়ে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘রাত ১১টার পর আমাদের ওসি মশিউর রহমানের রুমে নিয়ে চর, থাপ্পড়, কিল-ঘুষি ও বুট দিয়ে লাথি মারা হয়।" সাক্ষী জানান, ওই রাতেই এসআই আকিকুল ওসিকে বলেন, 'স্যার এদের ব্রেন ওয়াশ করা, এরা কিছু বলবে না। এদেরকে গুলি করে দেন।' পরদিন সন্ধ্যায় ডিবি অফিস থেকে তাদের চোখ ও হাত বেঁধে চৌগাছার বন্দলীতলা মাঠের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়।
গুলি করার মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে ইসরাফিল বলেন, “সেখানে আমরা গুলির শব্দ পাই। তখন একজন বলে ওঠে ‘ফায়ার অফ’। কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারি তিনি ওসি মশিউর। এর অল্প কিছুক্ষণ পর ওসি মশিউর বললেন, ‘সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার’। সাথে সাথে বিকট শব্দ হয় এবং আমার বন্ধু রুহুল আমিন মাগো বলে চিৎকার করে ওঠে। এর অল্প কিছুক্ষণ পর আমি আমার বাম পায়ের হাঁটুতে বন্দুকের স্পর্শ পাই এবং বিকট শব্দে আমার পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়।”
এ সময় ট্রাইব্যুনালে অঝোরে কাঁদতে থাকেন সাক্ষী ইসরাফিল। তিনি বলেন, ‘পড়ে যাওয়ার পর পুলিশ আমার হাতের হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেয়। তারা কিছু ধুলাবালি আমার ক্ষতস্থানে মেখে তা গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়। পঙ্গু হাসপাতালে ১৫ দিন চিকিৎসার পর পায়ে পচন ধরে যায়। ফলে আমার বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়।’
ইসরাফিল আদালতকে জানান, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই পুরো ঘটনার জন্য তিনি তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমানসহ জড়িত আট পুলিশের শাস্তি দাবি করেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ইসরাফিল হোসেনকে জেরা করেন গ্রেপ্তারকৃত আসামি এসআই আকিকুল ইসলামের আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন। জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, পুলিশ তাদের ব্যাগ তল্লাশি করে অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য পেয়েছিল। জবাবে সাক্ষী বলেন, "ইহা সত্য নয়।"
আইনজীবী আরও প্রশ্ন করেন যে, শিবির নেতারা পুলিশের প্রতি হাতবোমা নিক্ষেপ করেছিল এবং তাতে পুলিশ সদস্য আহত হয়েছিল কি না। এর জবাবে সাবেক এই শিবির নেতা বলেন, ‘ইহা সত্য নয় যে, আমরা পুলিশের প্রতি হাতবোমা নিক্ষেপ করেছি, যাতে পুলিশ সদস্য জহিরুল হক ও সিরাজুল আহত হয়েছেন। কনস্টেবল সিরাজ ও জহিরুলকে আমাদের সাথে পুলিশ ভ্যানে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে- এই কথাও সত্য নয়।’
এদিন শুনানির সময় গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামি- চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হককে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার অন্য পাঁচ আসামি- তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
গত ২০ এপ্রিল এই আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমানকে এবং তারও আগে এসআই আকিকুল ইসলামকে এই মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আগামী ২৫ জুন দিন ধার্য করেছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আব্দুস সাত্তার পালোয়ান।

আপনার মতামত লিখুন