‘সংবাদ’-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কিছু লিখতে গিয়ে বারবার শুধু শ্রদ্ধেয় জহুর ভাইর কথাই মনে পড়ছে| ১৯৫৪ থেকে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন পর্যন্ত একটানা ১৭ বছর জহুর হোসেন চৌধুরী ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক ছিলেন| এই ১৭টি বছর ছিল বাংলাদেশের এক উত্তাল সময়| বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই বাঙালি তথা বাংলাভাষী মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে| ১৯৫৭-৫৮-তে সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি ও স্বৈরশাসক আইউব খানের ক্ষমতা দখল গণতন্ত্রের আন্দোলনকে আরও বেগবান করে| ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আইউবের পতন ঘটালেও বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে যায়, নয় মাসের যুদ্ধের পর পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের উত্থান হয়|
উত্তাল সেই ১৭ বছর ‘সংবাদ’ একটি দৈনিক পত্রিকা হিসেবে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল| ‘সংবাদ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, কলাম বাঙালি জাতির গণআন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, দিকনির্দেশনা দিয়েছে| ‘সংবাদ’-এর সাহসী ভূমিকার উৎস ছিলেন সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী| তিনি শুধু সাহসী সম্পাদক ছিলেন না, ছিলেন এদেশে সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ|
সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি জহুর হোসেন চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ৪৬ বছর আগে| ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তার কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে| ২৩ বছর বয়সে ১৯৪৫ সালে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু| ১৯৮০ সালের নভেম্বরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত তাঁর সাংবাদিকতা অব্যাহত ছিল| অসুস্থ শরীরেও তিনি একটানা প্রায় পাঁচ বছর লিখে গেছেন তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’|
সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জহুর হেসেন চৌধুরীর শততম জন্মদিন ছিলো ২০২১ সালের ২৭ জুন| তাঁর জন্ম ১৯২২ সালের এই তারিখে বর্তমান ফেনি জেলার দাগনভুঁইয়া উপজেলার রামনগর গ্রামে| তাঁর পিতা সাদাত হোসেন চৌধুরী ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট| কর্মস্থল ছিলো সিরাজগঞ্জ| সেখানেই এক উচ্চ বিদ্যালয়ে জহুর হোসেন চৌধুরী শিক্ষাগ্রহণ করেন ও ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন| এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৪০ সালে আই. এ. ও ১৯৪২ সালে ইতিহাসে অনার্সসহ বি. এ. পাস করেন|
জহুর হোসেন চৌধুরীর সাংবাদিক জীবনের সূচনা হয় হাবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ১৯৪৫ সালে| এরপর তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেটসম্যান’, ‘কমরেড’ ও ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায়| ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং কিছুকাল সরকারি চাকরি করেন| পরে আবার তিনি সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন এবং ‘উপাত্ত’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা এবং ইংরেজি ˆদনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন| ১৯৫১ সালে ‘সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন| ১৯৫৪ সালে তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন| ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনির হামলা শুরু হওয়ার পর বংশাল রোডে ‘সংবাদ’ কার্যালয় পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং পত্রিকার প্রকাশনা ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে| পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন| তিনি আজীবন ‘সংবাদ’-এর অন্যতম পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন|
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি নেন এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ‘কাউন্টার পয়েন্ট’ নামে একটি ইংরেজি সাময়িকীর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন| ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে তিনি ‘সংবাদ’-এ তাঁর বিখ্যাত কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’ লিখতে শুরু করেন| কলামটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যার ফলে পাঠকদের কাছে পত্রিকার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়| প্রথমদিকে কলামটি সপ্তাহে একবার প্রকাশিত হতো, পরে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে জহুর হোসেন চৌধুরী সপ্তাহে দুই দিন কলামটি লিখতেন এবং শেষ পর্যন্ত তাই লিখে গেছেন| এই কলামে তিনি জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন| তাঁর সংবাদ বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও মন্তব্য পাঠকদের মুগ্ধ করতো| তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও মন্তব্য প্রকাশ করতেন| এর মূল্যও তাকে দিতে হয়েছিলো| মৃত্যুর বছর খানেক আগে তাঁর কোনো একটি নিবন্ধের কারণে তৎকালীন সরকার অসন্তুষ্ট হয় এবং তাঁকে গ্রেফতার করা হয়| রমনা থানার পুলিশ রাত ১২টায় তাঁকে ধানমণ্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করে থানায় এনে বসিয়ে রাখে এবং পরদিন জামিনে মুক্তি দেয়া হয়| অসুস্থ জহুর হোসেন চৌধুরী এই ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন এবং তাঁর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হয়|
জহুর হোসেন চৌধুরী ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১, প্রায় ১৭ বছর সংবাদ-এর সম্পাদক ছিলেন| এই সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের খবর পত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হতো| সে কারণে পত্রিকাটি রাজনৈতিক মহলে ও জনগণের কাছে প্রিয় ছিলো| সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জহুর হোসেন চৌধুরী অবিস্মরণীয়|
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী| ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তিনি প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম অবৈতনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন| স্বাধীনতার পর ক্লাবের নাম হয় ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব’| তাঁর স্মরণে ক্লাব ভবনের দোতলায় প্রধান মিলনায়তনের নাম রাখা হয়েছে ‘জহুর হোসেন চৌধুরী হল’|
সমাজসচেতন মানুষ জহুর হোসেন চৌধুরী প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন| ছাত্রজীবন শেষে তিনি বাম রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন এবং কমিউনিস্ট নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম.এন. রায়)-এর র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দেন| বেশ কিছুকাল এই দলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো| পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর প্রাদেশিক কমিটির সদস্য ছিলেন| প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও জহুর হোসেন চৌধুরী বিশেষ সক্রিয় ছিলেন| তিনি পাক-চীন ˆমত্রী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং পাক-সোভিয়েত ˆমত্রী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন|
সাংবাদিকদের মধ্যে জহুর হোসেন চৌধুরী খুবই জনপ্রিয় ছিলেন| নবীন ও প্রবীণ— সব সাংবাদিক তাঁকে জহুর ভাই বলে ডাকতেন| বয়সে ছোট অথবা বড়, সবার সঙ্গেই তাঁর ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক| ¯^াধীনতার পর আমি যখন ‘সংবাদ’-এর বার্তা বিভাগে যোগ দেই, তখন থেকেই জহুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এই সম্পর্ক তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিলো| আমার সঙ্গে তিনি মন খুলে কথা বলতেন| অনেক কিছু তাঁর কাছে শিখেছি, অনেক কিছু জেনেছি| আমি সাংবাদিকতা ও লেখালেখির জগতেই আছি| তাঁর চিন্তাধারা আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে|
সংবাদপত্র জগতের জন্য যে অবদান জহুর ভাই রেখে গেছেন, সেজন্য সাংবাদিকরা তাঁর কাছে চিরঋণী| এই ঋণ আমরা শোধ করতে পারবো না| জহুর ভাইয়ের জন্য আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিলো, রয়েছে এবং থাকবে| এছাড়া তাঁকে দেবার মতো আমাদের তো আর কিছু নেই|

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
‘সংবাদ’-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কিছু লিখতে গিয়ে বারবার শুধু শ্রদ্ধেয় জহুর ভাইর কথাই মনে পড়ছে| ১৯৫৪ থেকে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন পর্যন্ত একটানা ১৭ বছর জহুর হোসেন চৌধুরী ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক ছিলেন| এই ১৭টি বছর ছিল বাংলাদেশের এক উত্তাল সময়| বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই বাঙালি তথা বাংলাভাষী মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে| ১৯৫৭-৫৮-তে সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি ও স্বৈরশাসক আইউব খানের ক্ষমতা দখল গণতন্ত্রের আন্দোলনকে আরও বেগবান করে| ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আইউবের পতন ঘটালেও বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে যায়, নয় মাসের যুদ্ধের পর পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের উত্থান হয়|
উত্তাল সেই ১৭ বছর ‘সংবাদ’ একটি দৈনিক পত্রিকা হিসেবে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল| ‘সংবাদ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, কলাম বাঙালি জাতির গণআন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, দিকনির্দেশনা দিয়েছে| ‘সংবাদ’-এর সাহসী ভূমিকার উৎস ছিলেন সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী| তিনি শুধু সাহসী সম্পাদক ছিলেন না, ছিলেন এদেশে সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ|
সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি জহুর হোসেন চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ৪৬ বছর আগে| ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তার কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে| ২৩ বছর বয়সে ১৯৪৫ সালে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু| ১৯৮০ সালের নভেম্বরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত তাঁর সাংবাদিকতা অব্যাহত ছিল| অসুস্থ শরীরেও তিনি একটানা প্রায় পাঁচ বছর লিখে গেছেন তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’|
সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জহুর হেসেন চৌধুরীর শততম জন্মদিন ছিলো ২০২১ সালের ২৭ জুন| তাঁর জন্ম ১৯২২ সালের এই তারিখে বর্তমান ফেনি জেলার দাগনভুঁইয়া উপজেলার রামনগর গ্রামে| তাঁর পিতা সাদাত হোসেন চৌধুরী ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট| কর্মস্থল ছিলো সিরাজগঞ্জ| সেখানেই এক উচ্চ বিদ্যালয়ে জহুর হোসেন চৌধুরী শিক্ষাগ্রহণ করেন ও ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন| এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৪০ সালে আই. এ. ও ১৯৪২ সালে ইতিহাসে অনার্সসহ বি. এ. পাস করেন|
জহুর হোসেন চৌধুরীর সাংবাদিক জীবনের সূচনা হয় হাবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ১৯৪৫ সালে| এরপর তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেটসম্যান’, ‘কমরেড’ ও ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায়| ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং কিছুকাল সরকারি চাকরি করেন| পরে আবার তিনি সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন এবং ‘উপাত্ত’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা এবং ইংরেজি ˆদনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন| ১৯৫১ সালে ‘সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন| ১৯৫৪ সালে তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন| ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনির হামলা শুরু হওয়ার পর বংশাল রোডে ‘সংবাদ’ কার্যালয় পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং পত্রিকার প্রকাশনা ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে| পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন| তিনি আজীবন ‘সংবাদ’-এর অন্যতম পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন|
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি নেন এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ‘কাউন্টার পয়েন্ট’ নামে একটি ইংরেজি সাময়িকীর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন| ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে তিনি ‘সংবাদ’-এ তাঁর বিখ্যাত কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’ লিখতে শুরু করেন| কলামটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যার ফলে পাঠকদের কাছে পত্রিকার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়| প্রথমদিকে কলামটি সপ্তাহে একবার প্রকাশিত হতো, পরে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে জহুর হোসেন চৌধুরী সপ্তাহে দুই দিন কলামটি লিখতেন এবং শেষ পর্যন্ত তাই লিখে গেছেন| এই কলামে তিনি জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন| তাঁর সংবাদ বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও মন্তব্য পাঠকদের মুগ্ধ করতো| তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও মন্তব্য প্রকাশ করতেন| এর মূল্যও তাকে দিতে হয়েছিলো| মৃত্যুর বছর খানেক আগে তাঁর কোনো একটি নিবন্ধের কারণে তৎকালীন সরকার অসন্তুষ্ট হয় এবং তাঁকে গ্রেফতার করা হয়| রমনা থানার পুলিশ রাত ১২টায় তাঁকে ধানমণ্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করে থানায় এনে বসিয়ে রাখে এবং পরদিন জামিনে মুক্তি দেয়া হয়| অসুস্থ জহুর হোসেন চৌধুরী এই ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন এবং তাঁর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হয়|
জহুর হোসেন চৌধুরী ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১, প্রায় ১৭ বছর সংবাদ-এর সম্পাদক ছিলেন| এই সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের খবর পত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হতো| সে কারণে পত্রিকাটি রাজনৈতিক মহলে ও জনগণের কাছে প্রিয় ছিলো| সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জহুর হোসেন চৌধুরী অবিস্মরণীয়|
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী| ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তিনি প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম অবৈতনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন| স্বাধীনতার পর ক্লাবের নাম হয় ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব’| তাঁর স্মরণে ক্লাব ভবনের দোতলায় প্রধান মিলনায়তনের নাম রাখা হয়েছে ‘জহুর হোসেন চৌধুরী হল’|
সমাজসচেতন মানুষ জহুর হোসেন চৌধুরী প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন| ছাত্রজীবন শেষে তিনি বাম রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন এবং কমিউনিস্ট নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম.এন. রায়)-এর র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দেন| বেশ কিছুকাল এই দলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো| পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর প্রাদেশিক কমিটির সদস্য ছিলেন| প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও জহুর হোসেন চৌধুরী বিশেষ সক্রিয় ছিলেন| তিনি পাক-চীন ˆমত্রী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং পাক-সোভিয়েত ˆমত্রী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন|
সাংবাদিকদের মধ্যে জহুর হোসেন চৌধুরী খুবই জনপ্রিয় ছিলেন| নবীন ও প্রবীণ— সব সাংবাদিক তাঁকে জহুর ভাই বলে ডাকতেন| বয়সে ছোট অথবা বড়, সবার সঙ্গেই তাঁর ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক| ¯^াধীনতার পর আমি যখন ‘সংবাদ’-এর বার্তা বিভাগে যোগ দেই, তখন থেকেই জহুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এই সম্পর্ক তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিলো| আমার সঙ্গে তিনি মন খুলে কথা বলতেন| অনেক কিছু তাঁর কাছে শিখেছি, অনেক কিছু জেনেছি| আমি সাংবাদিকতা ও লেখালেখির জগতেই আছি| তাঁর চিন্তাধারা আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে|
সংবাদপত্র জগতের জন্য যে অবদান জহুর ভাই রেখে গেছেন, সেজন্য সাংবাদিকরা তাঁর কাছে চিরঋণী| এই ঋণ আমরা শোধ করতে পারবো না| জহুর ভাইয়ের জন্য আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিলো, রয়েছে এবং থাকবে| এছাড়া তাঁকে দেবার মতো আমাদের তো আর কিছু নেই|

আপনার মতামত লিখুন