মাত্র এক দশক আগেও ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়িতে বিড়াল পোষা ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রমী বিষয়। রাস্তা থেকে আহত কোনো বিড়ালকে আশ্রয় দেয়া কিংবা শিশুর আবদারে ঘরে একটি বিড়াল রাখার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দৃশ্যটি বদলে গেছে। হাজার হাজার টাকা খরচ করে পার্সিয়ান, সাইবেরিয়ান, স্কটিশ ফোল্ড কিংবা যার্গডলের মতো বিদেশি জাতের বিড়াল কেনা হচ্ছে। তাদের জন্য আসছে আমদানি করা খাবার, বিশেষ লিটার, খেলনা ও নানা ধরনের পরিচর্যার সামগ্রী। তৈরি হয়েছে পোষ্য ক্লিনিক, গ্রুমিং সেন্টার, ডে-কেয়ার, বোর্ডিং এমনকি ক্যাট হোটেলও।
দৃষ্টিতে এটি নিছক পোষ্যপ্রেমের পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, বিড়ালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নতুন বাজার আসলে বাংলাদেশের দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূূর্ণ প্রতিচ্ছবি। এখানে অর্থনীতি যেমন আছে, তেমনি আছে নগরায়ন, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, ভোগসংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান একাকীত্বের গল্প।
শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে শুধু বিড়ালের খাবারের বাজারই প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৩২ হাজার মেট্রিক টন বিড়ালের খাবার আমদানি হয়েছে। চীন, থাইল্যান্ড, ভারত ও তুরস্ক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। খাবারের পাশাপাশি লিটার, খেলনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সামগ্রী মিলিয়ে পোষ্যপণ্যের বাজারে বছরে শত শত কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পের হিসাবে এ বাজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০-২০ শতাংশ।
এই পরিবর্তনের পেছনে প্রথমেই চোখে পড়ে নগরজীবনের রূপান্তর। দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার দুর্বল হয়েছে, বেড়েছে একক পরিবার ও একা বসবাসের প্রবণতা। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে বহু তরুণ-তরুণী পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের পরিচিত পরিমণ্ডল থেকে দূরে শহরে বসবাস করছেন। ছোট ফ্ল্যাট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সীমিত সামাজিক যোগাযোগ অনেকের জীবনে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা তৈরি করছে। সেই শূন্যতায় বিড়াল হয়ে উঠছে নীরব, সঙ্গীসুলভ একটি উপস্থিতি।
বিড়াল পোষার প্রবণতা তাই শুধু অর্থনৈতিক সামর্থ্যের বিষয় নয়; এটি মানুষের আবেগ ও মানসিক প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত। একটি বিড়ালকে খাওয়ানো, তার যত্ন নেয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো কিংবা তার সঙ্গে সময় কাটানো অনেক শহুরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিড়ালের ছবি ও ভিডিও প্রকাশও এই সম্পর্ককে ব্যক্তিগত পরিসর থেকে প্রকাশ্য সামাজিক পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেন্সের ‘আধুনিকতা ও আত্মপরিচয়’ ধারণার আলোকে এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায়। আধুনিক সমাজে ব্যক্তির পরিচয় শুধু পরিবার, ঐতিহ্য কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও পছন্দের মাধ্যমেও পরিচয় নির্মিত হয়। কোন ধরনের বিড়াল পোষা হবে, তার খাবার কী হবে, কীভাবে পরিচর্যা করা হবে—এসবও তাই ব্যক্তির জীবনযাপন ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
জঁ বোদ্রিয়ারের ভোগবাদী সমাজের ধারণাও এখানে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক ভোগের জগতে মানুষ কোনো পণ্য শুধু তার ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য কেনে না; পণ্যের প্রতীকী অর্থও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকার কোনো উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের দামী বিদেশি জাতের বিড়াল, আমদানি করা খাবার কিংবা বিশেষায়িত পরিচর্যার সামগ্রী তাই শুধু পোষ্য পালনের উপকরণ নয়; এগুলো রুচি, সামর্থ্য ও জীবনযাপনেরও সংকেত বহন করতে পারে। সামাজিক মাধ্যম সেই সংকেতকে আরও দৃশ্যমান করে।
পিয়ের বুর্দিয়োর ‘পার্থক্যকরণ’ ধারণার দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কোন জাতের বিড়াল জনপ্রিয়, কোন খাবার উন্নত, কোন ক্লিনিকে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় কিংবা কোথায় আধুনিক গ্রুমিং করা হয়—এসব বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান একটি নতুন ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা তৈরি করছে। ফলে পোষ্যপালন শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, একটি স্বতন্ত্র শহুরে উপসংস্কৃতির অংশও হয়ে উঠছে।
এর অর্থনৈতিক প্রভাবও উপেক্ষা করার মতো নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বড় শহরে পোষ্য চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ছে। টিকাদান, অস্ত্রোপচার, রোগনির্ণয়, গ্রুমিং ও পরামর্শসেবা এখন একটি বিস্তৃত বাজার তৈরি করেছে। অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসায় বিক্রি হচ্ছে লিটার, ক্যারিয়ার, খেলনা, স্ক্র্যাচিং পোস্টসহ নানা সামগ্রী। ডে-কেয়ার, বোর্ডিং, গ্রুমিং এবং পোষ্যকেন্দ্রিক কনটেন্ট তৈরিও নতুন অ॥র্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ ‘বিড়াল অর্থনীতি’ ছোট হলেও এটি নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এই বাজারের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ক্যাট ব্রিডিং ও পোষ্য ব্যবসার বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক ও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অবৈজ্ঞানিক আন্তঃপ্রজনন, জিনগত সমস্যা এবং প্রাণীর প্রতি অমানবিক আচরণ উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে খাবার, ওষুধ ও টিকার ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা এই খাতকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। বাজার বড় হওয়ার আগেই এসব বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় আরও গভীরভাবে ভাবা দরকার। বিদেশি জাতের বিড়ালের জন্য ব্যয়বহুল খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার বাজার বাড়ছে, অথচ একই শহরের রাস্তায় অসংখ্য দেশি বিড়াল ক্ষুধা, রোগ ও অবহেলায় দিন কাটাচ্ছে। একদিকে বিলাসী পোষ্য অর্থনীতি, অন্যদিকে অবহেলিত প্রাণী—এই বৈপরীত্য আমাদের নগর সমাজের আয় ও ভোগের অসমতাকেও প্রতিফলিত করে।
তবে এ কারণে পোষ্যপালনের প্রবণতাকে নিছক বিলাসিতা বলে উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে না। বরং এর মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের পরিবর্তনগুলো পড়তে হবে। নগরায়ন মানুষের বসবাসের ধরন বদলাচ্ছে, পরিবার বদলাচ্ছে, সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে, অবসর ও বিনোদনের ধরন বদলাচ্ছে। সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে ভালোবাসা ও সঙ্গী নির্বাচনের ধরনও। বিড়াল সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান প্রতীক।
বিশেষ করে তরুণ শহুরে মানুষের একটি অংশ তাদের ইচ্ছাধীন আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পোষ্য প্রাণীর পেছনে ব্যয় করছেন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রকাশ যেমন আছে, তেমনি আছে স্বাধীনতা, আবেগ, সঙ্গ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও। ফলে বিড়াল এখানে একই সঙ্গে প্রাণী, সঙ্গী, ভোগের বস্তু এবং আত্মপরিচয়ের অংশ।
এই উদীয়মান খাতকে তাই দায়িত্বশীলভাবে বিকশিত করার প্রয়োজন রয়েছে। পোষ্য প্রাণীর প্রজনন ও কল্যাণে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ, আমদানিকৃত খাবার ও ওষুধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাণী চিকিৎসার মান নিয়ন্ত্রণ এবং অমানবিক ব্যবসায়িক চর্চা বন্ধে নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে দেশীয়ভাবে নিরাপদ পোষ্যখাদ্য ও আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেয়া যেতে পারে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, ‘বিড়াল অর্থনীতি’কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ এটি কোনো দিন তৈরি পোশাক বা প্রবাসী আয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বলে নয়। এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি আমাদের সমাজের এমন কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান করে, যা প্রচলিত অর্থনৈতিক সূচকে ধরা পড়ে না। একটি বিড়ালের খাবার, লিটার, চিকিৎসা কিংবা গ্রুমিংয়ের ব্যয়ের ভেতর দিয়ে আমরা নগর মধ্যবিত্তের নতুন ভোগচাহিদা দেখতে পাই। একটি ফ্ল্যাটে বিড়ালের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে দেখতে পাই একাকীত্ব, স্বাধীনতা ও পরিবর্তিত পারিবারিক সম্পর্কের গল্প।
অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো ছোট একটি বাজার। কিন্তু সমাজের ভাষায় এটি বড় একটি সংকেত। বাংলাদেশের শহরগুলো যত বদলাবে, মানুষের চাহিদা ও সম্পর্কের ধরনও তত বদলাবে। সেই পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছে বিড়াল। তাই ‘মিউ মিউ অর্থনীতি’ আসলে শুধু বিড়ালের খাবার, চিকিৎসা বা খেলনার বাজার নয়; এটি বদলে যাওয়া শহুরে বাংলাদেশের জীবন, মনস্তত্ত্ব ও ভোগসংস্কৃতির একটি ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ দর্পণ।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী। ]

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
মাত্র এক দশক আগেও ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়িতে বিড়াল পোষা ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রমী বিষয়। রাস্তা থেকে আহত কোনো বিড়ালকে আশ্রয় দেয়া কিংবা শিশুর আবদারে ঘরে একটি বিড়াল রাখার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দৃশ্যটি বদলে গেছে। হাজার হাজার টাকা খরচ করে পার্সিয়ান, সাইবেরিয়ান, স্কটিশ ফোল্ড কিংবা যার্গডলের মতো বিদেশি জাতের বিড়াল কেনা হচ্ছে। তাদের জন্য আসছে আমদানি করা খাবার, বিশেষ লিটার, খেলনা ও নানা ধরনের পরিচর্যার সামগ্রী। তৈরি হয়েছে পোষ্য ক্লিনিক, গ্রুমিং সেন্টার, ডে-কেয়ার, বোর্ডিং এমনকি ক্যাট হোটেলও।
দৃষ্টিতে এটি নিছক পোষ্যপ্রেমের পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, বিড়ালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নতুন বাজার আসলে বাংলাদেশের দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূূর্ণ প্রতিচ্ছবি। এখানে অর্থনীতি যেমন আছে, তেমনি আছে নগরায়ন, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, ভোগসংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান একাকীত্বের গল্প।
শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে শুধু বিড়ালের খাবারের বাজারই প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৩২ হাজার মেট্রিক টন বিড়ালের খাবার আমদানি হয়েছে। চীন, থাইল্যান্ড, ভারত ও তুরস্ক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। খাবারের পাশাপাশি লিটার, খেলনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সামগ্রী মিলিয়ে পোষ্যপণ্যের বাজারে বছরে শত শত কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পের হিসাবে এ বাজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০-২০ শতাংশ।
এই পরিবর্তনের পেছনে প্রথমেই চোখে পড়ে নগরজীবনের রূপান্তর। দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার দুর্বল হয়েছে, বেড়েছে একক পরিবার ও একা বসবাসের প্রবণতা। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে বহু তরুণ-তরুণী পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের পরিচিত পরিমণ্ডল থেকে দূরে শহরে বসবাস করছেন। ছোট ফ্ল্যাট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সীমিত সামাজিক যোগাযোগ অনেকের জীবনে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা তৈরি করছে। সেই শূন্যতায় বিড়াল হয়ে উঠছে নীরব, সঙ্গীসুলভ একটি উপস্থিতি।
বিড়াল পোষার প্রবণতা তাই শুধু অর্থনৈতিক সামর্থ্যের বিষয় নয়; এটি মানুষের আবেগ ও মানসিক প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত। একটি বিড়ালকে খাওয়ানো, তার যত্ন নেয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো কিংবা তার সঙ্গে সময় কাটানো অনেক শহুরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিড়ালের ছবি ও ভিডিও প্রকাশও এই সম্পর্ককে ব্যক্তিগত পরিসর থেকে প্রকাশ্য সামাজিক পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেন্সের ‘আধুনিকতা ও আত্মপরিচয়’ ধারণার আলোকে এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায়। আধুনিক সমাজে ব্যক্তির পরিচয় শুধু পরিবার, ঐতিহ্য কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও পছন্দের মাধ্যমেও পরিচয় নির্মিত হয়। কোন ধরনের বিড়াল পোষা হবে, তার খাবার কী হবে, কীভাবে পরিচর্যা করা হবে—এসবও তাই ব্যক্তির জীবনযাপন ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
জঁ বোদ্রিয়ারের ভোগবাদী সমাজের ধারণাও এখানে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক ভোগের জগতে মানুষ কোনো পণ্য শুধু তার ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য কেনে না; পণ্যের প্রতীকী অর্থও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকার কোনো উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের দামী বিদেশি জাতের বিড়াল, আমদানি করা খাবার কিংবা বিশেষায়িত পরিচর্যার সামগ্রী তাই শুধু পোষ্য পালনের উপকরণ নয়; এগুলো রুচি, সামর্থ্য ও জীবনযাপনেরও সংকেত বহন করতে পারে। সামাজিক মাধ্যম সেই সংকেতকে আরও দৃশ্যমান করে।
পিয়ের বুর্দিয়োর ‘পার্থক্যকরণ’ ধারণার দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কোন জাতের বিড়াল জনপ্রিয়, কোন খাবার উন্নত, কোন ক্লিনিকে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় কিংবা কোথায় আধুনিক গ্রুমিং করা হয়—এসব বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান একটি নতুন ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা তৈরি করছে। ফলে পোষ্যপালন শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, একটি স্বতন্ত্র শহুরে উপসংস্কৃতির অংশও হয়ে উঠছে।
এর অর্থনৈতিক প্রভাবও উপেক্ষা করার মতো নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বড় শহরে পোষ্য চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ছে। টিকাদান, অস্ত্রোপচার, রোগনির্ণয়, গ্রুমিং ও পরামর্শসেবা এখন একটি বিস্তৃত বাজার তৈরি করেছে। অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসায় বিক্রি হচ্ছে লিটার, ক্যারিয়ার, খেলনা, স্ক্র্যাচিং পোস্টসহ নানা সামগ্রী। ডে-কেয়ার, বোর্ডিং, গ্রুমিং এবং পোষ্যকেন্দ্রিক কনটেন্ট তৈরিও নতুন অ॥র্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ ‘বিড়াল অর্থনীতি’ ছোট হলেও এটি নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এই বাজারের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ক্যাট ব্রিডিং ও পোষ্য ব্যবসার বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক ও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অবৈজ্ঞানিক আন্তঃপ্রজনন, জিনগত সমস্যা এবং প্রাণীর প্রতি অমানবিক আচরণ উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে খাবার, ওষুধ ও টিকার ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা এই খাতকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। বাজার বড় হওয়ার আগেই এসব বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় আরও গভীরভাবে ভাবা দরকার। বিদেশি জাতের বিড়ালের জন্য ব্যয়বহুল খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার বাজার বাড়ছে, অথচ একই শহরের রাস্তায় অসংখ্য দেশি বিড়াল ক্ষুধা, রোগ ও অবহেলায় দিন কাটাচ্ছে। একদিকে বিলাসী পোষ্য অর্থনীতি, অন্যদিকে অবহেলিত প্রাণী—এই বৈপরীত্য আমাদের নগর সমাজের আয় ও ভোগের অসমতাকেও প্রতিফলিত করে।
তবে এ কারণে পোষ্যপালনের প্রবণতাকে নিছক বিলাসিতা বলে উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে না। বরং এর মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের পরিবর্তনগুলো পড়তে হবে। নগরায়ন মানুষের বসবাসের ধরন বদলাচ্ছে, পরিবার বদলাচ্ছে, সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে, অবসর ও বিনোদনের ধরন বদলাচ্ছে। সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে ভালোবাসা ও সঙ্গী নির্বাচনের ধরনও। বিড়াল সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান প্রতীক।
বিশেষ করে তরুণ শহুরে মানুষের একটি অংশ তাদের ইচ্ছাধীন আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পোষ্য প্রাণীর পেছনে ব্যয় করছেন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রকাশ যেমন আছে, তেমনি আছে স্বাধীনতা, আবেগ, সঙ্গ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও। ফলে বিড়াল এখানে একই সঙ্গে প্রাণী, সঙ্গী, ভোগের বস্তু এবং আত্মপরিচয়ের অংশ।
এই উদীয়মান খাতকে তাই দায়িত্বশীলভাবে বিকশিত করার প্রয়োজন রয়েছে। পোষ্য প্রাণীর প্রজনন ও কল্যাণে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ, আমদানিকৃত খাবার ও ওষুধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাণী চিকিৎসার মান নিয়ন্ত্রণ এবং অমানবিক ব্যবসায়িক চর্চা বন্ধে নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে দেশীয়ভাবে নিরাপদ পোষ্যখাদ্য ও আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেয়া যেতে পারে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, ‘বিড়াল অর্থনীতি’কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ এটি কোনো দিন তৈরি পোশাক বা প্রবাসী আয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বলে নয়। এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি আমাদের সমাজের এমন কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান করে, যা প্রচলিত অর্থনৈতিক সূচকে ধরা পড়ে না। একটি বিড়ালের খাবার, লিটার, চিকিৎসা কিংবা গ্রুমিংয়ের ব্যয়ের ভেতর দিয়ে আমরা নগর মধ্যবিত্তের নতুন ভোগচাহিদা দেখতে পাই। একটি ফ্ল্যাটে বিড়ালের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে দেখতে পাই একাকীত্ব, স্বাধীনতা ও পরিবর্তিত পারিবারিক সম্পর্কের গল্প।
অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো ছোট একটি বাজার। কিন্তু সমাজের ভাষায় এটি বড় একটি সংকেত। বাংলাদেশের শহরগুলো যত বদলাবে, মানুষের চাহিদা ও সম্পর্কের ধরনও তত বদলাবে। সেই পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছে বিড়াল। তাই ‘মিউ মিউ অর্থনীতি’ আসলে শুধু বিড়ালের খাবার, চিকিৎসা বা খেলনার বাজার নয়; এটি বদলে যাওয়া শহুরে বাংলাদেশের জীবন, মনস্তত্ত্ব ও ভোগসংস্কৃতির একটি ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ দর্পণ।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী। ]

আপনার মতামত লিখুন