সংবাদ

শেরপুরের ‘জামুর ঢিবি’: রহস্যে ঘেরা এক প্রাচীন জনপদ!


প্রতিনিধি, শেরপুর (বগুড়া)
প্রতিনিধি, শেরপুর (বগুড়া)
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২ পিএম

শেরপুরের ‘জামুর ঢিবি’: রহস্যে ঘেরা এক প্রাচীন জনপদ!
ছবি : সংবাদ

সবুজ ফসলের মাঠে জেগে আছে এক বিশাল ঢিবি। চারপাশে নিবিড় গ্রামীণ পরিবেশ। কিন্তু এই শান্ত ঢিবিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের আদম জামুর গ্রামের ‘জামুর ঢিবি’ স্থানীয়ভাবে ‘ধনপোতা ঢিবি’ নামেও পরিচিত।

স্থানীয় লোকজনের ধারণা, ঢিবির নিচে চাপা পড়ে আছে কোনো প্রাচীন রাজবাড়ি। কেউ বলেন, এখানে ছিল প্রাচীন কোনো ধর্মীয় স্থাপনা। আবার কারও মতে, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাচীন কোনো জনপদের চিহ্ন। তবে এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর মিলতে পারে একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানেই।

শেরপুর উপজেলা শহর থেকে জামুর ঢিবির দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। শেরপুর-নন্দীগ্রাম আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে কুসুম্বী ইউনিয়নের বেলঘরিয়া বাজারে যাওয়া যায়। বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আদম জামুর গ্রামের পাশে এই ঢিবির অবস্থান। গ্রামের পাকা সড়ক থেকেই এটি দেখা যায়। সমতল জমির তুলনায় ঢিবিটি বেশ উঁচু। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঢিবিটি আগে আরও উঁচু ছিল, তবে সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে মাটিতে দেবে গেছে। তাদের হিসাবে, বর্তমানে এর উচ্চতা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ ফুট এবং আয়তন প্রায় দুই থেকে আড়াই একর। ঢিবির ওপর ও চারপাশে রয়েছে হরেক রকমের গাছপালা। দূর থেকেই সবুজে ঘেরা ঢিবিটি আলাদাভাবে চোখে পড়ে।

তবে এই সবুজের আড়ালেই রয়েছে ক্ষয়ের চিহ্ন। ঢিবির নিচের অংশের মাটি কেটে আশপাশের জমি চাষাবাদের উপযোগী করা হয়েছে। উপরের অংশেও মাটি কাটার দাগ স্পষ্ট। কাটা মাটিতে পুরোনো ইট ও মাটির তৈজসপত্রের টুকরাও দেখতে পাওয়া যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা মমতাজ আলী প্রামাণিকের বয়স ৭৫ বছর। তিনি শৈশবে ঢিবিটিকে বর্তমানের তুলনায় অনেক উঁচু দেখেছেন। তার বাবা-দাদারাও এই ঢিবির কথা জানতেন। মমতাজ আলী প্রামাণিক বলেন, সময়ের সঙ্গে ঢিবিটি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে যাচ্ছে। একসময় আশপাশের গ্রামের মানুষ এখান থেকে মাটি কেটে পুরোনো ইটের টুকরা সংগ্রহ করতেন এবং গৃহস্থালি নানা কাজে ব্যবহার করতেন।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এসব গল্পের সঙ্গে ইতিহাসের কিছু সূত্র মেলে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বগুড়া অঞ্চল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন জনপদ ও স্থাপনার বিকাশ ঘটেছে। ফলে জামুর ঢিবিকে ঘিরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

জামুর ইসলামিয়া কলেজের ইসলামের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক মো. সুজাউদ্দৌলা মনে করেন, ঢিবিটি নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো পরীক্ষা করে দেখা দরকার। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হলে এর ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

কুসুম্বী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ শাহ আলম পান্না ঢিবিটি খনন ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান জামুর ঢিবি পরিদর্শন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানোর উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়ার আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘এত বড় ঢিবি সাধারণত দেখা যায় না। উত্তরবঙ্গে ১৬১টি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষিত আছে, যার মধ্যে জামুর ঢিবিও রয়েছে। ঢিবিটি ২০১৫-১৬ সালের দিকে সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় বলা না গেলেও এটি খননের বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকারে রয়েছে।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


শেরপুরের ‘জামুর ঢিবি’: রহস্যে ঘেরা এক প্রাচীন জনপদ!

প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সবুজ ফসলের মাঠে জেগে আছে এক বিশাল ঢিবি। চারপাশে নিবিড় গ্রামীণ পরিবেশ। কিন্তু এই শান্ত ঢিবিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের আদম জামুর গ্রামের ‘জামুর ঢিবি’ স্থানীয়ভাবে ‘ধনপোতা ঢিবি’ নামেও পরিচিত।

স্থানীয় লোকজনের ধারণা, ঢিবির নিচে চাপা পড়ে আছে কোনো প্রাচীন রাজবাড়ি। কেউ বলেন, এখানে ছিল প্রাচীন কোনো ধর্মীয় স্থাপনা। আবার কারও মতে, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাচীন কোনো জনপদের চিহ্ন। তবে এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর মিলতে পারে একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানেই।

শেরপুর উপজেলা শহর থেকে জামুর ঢিবির দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। শেরপুর-নন্দীগ্রাম আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে কুসুম্বী ইউনিয়নের বেলঘরিয়া বাজারে যাওয়া যায়। বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আদম জামুর গ্রামের পাশে এই ঢিবির অবস্থান। গ্রামের পাকা সড়ক থেকেই এটি দেখা যায়। সমতল জমির তুলনায় ঢিবিটি বেশ উঁচু। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঢিবিটি আগে আরও উঁচু ছিল, তবে সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে মাটিতে দেবে গেছে। তাদের হিসাবে, বর্তমানে এর উচ্চতা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ ফুট এবং আয়তন প্রায় দুই থেকে আড়াই একর। ঢিবির ওপর ও চারপাশে রয়েছে হরেক রকমের গাছপালা। দূর থেকেই সবুজে ঘেরা ঢিবিটি আলাদাভাবে চোখে পড়ে।

তবে এই সবুজের আড়ালেই রয়েছে ক্ষয়ের চিহ্ন। ঢিবির নিচের অংশের মাটি কেটে আশপাশের জমি চাষাবাদের উপযোগী করা হয়েছে। উপরের অংশেও মাটি কাটার দাগ স্পষ্ট। কাটা মাটিতে পুরোনো ইট ও মাটির তৈজসপত্রের টুকরাও দেখতে পাওয়া যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা মমতাজ আলী প্রামাণিকের বয়স ৭৫ বছর। তিনি শৈশবে ঢিবিটিকে বর্তমানের তুলনায় অনেক উঁচু দেখেছেন। তার বাবা-দাদারাও এই ঢিবির কথা জানতেন। মমতাজ আলী প্রামাণিক বলেন, সময়ের সঙ্গে ঢিবিটি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে যাচ্ছে। একসময় আশপাশের গ্রামের মানুষ এখান থেকে মাটি কেটে পুরোনো ইটের টুকরা সংগ্রহ করতেন এবং গৃহস্থালি নানা কাজে ব্যবহার করতেন।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এসব গল্পের সঙ্গে ইতিহাসের কিছু সূত্র মেলে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বগুড়া অঞ্চল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন জনপদ ও স্থাপনার বিকাশ ঘটেছে। ফলে জামুর ঢিবিকে ঘিরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

জামুর ইসলামিয়া কলেজের ইসলামের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক মো. সুজাউদ্দৌলা মনে করেন, ঢিবিটি নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো পরীক্ষা করে দেখা দরকার। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হলে এর ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

কুসুম্বী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ শাহ আলম পান্না ঢিবিটি খনন ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান জামুর ঢিবি পরিদর্শন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানোর উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়ার আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘এত বড় ঢিবি সাধারণত দেখা যায় না। উত্তরবঙ্গে ১৬১টি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষিত আছে, যার মধ্যে জামুর ঢিবিও রয়েছে। ঢিবিটি ২০১৫-১৬ সালের দিকে সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় বলা না গেলেও এটি খননের বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকারে রয়েছে।’


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত