প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। এই পর্যায়ে শিশুকে শুধু বই পড়ানো নয়; বরং খেলাধুলা, গল্প, গান, ছবি, কথোপকথন, হাতে-কলমে কাজ এবং নানা ধরনের আনন্দময় কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়। তাই প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষকতা অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় আলাদা দক্ষতা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা ও শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি দাবি করে।
বর্তমান ব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে প্রায় আড়াই ঘণ্টার একটি দীর্ঘ ব্লকে প্রাক-প্রাথমিকের পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৩০ মিনিট নির্দেশিত খেলা ও মুক্ত খেলার জন্য নির্ধারিত থাকে। অনেকের কাছে এটি হয়তো 'খেলার সময়' মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে একজন শিক্ষকের জন্য এটিও যথেষ্ট দায়িত্বপূর্ণ সময়। কারণ শিশুদের খেলাধুলার সময়ও শিক্ষককে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হয়, প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা দিতে হয় এবং তাদের অংশগ্রহণে সহায়তা করতে হয়।
অর্থাৎ, আড়াই ঘণ্টার পুরো সময়টিই শিক্ষককে সক্রিয়ভাবে শিশুদের সঙ্গে থাকতে হয়।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—একজন শিক্ষক কি একটানা আড়াই ঘণ্টা একই মাত্রার শারীরিক ও মানসিক উদ্যম নিয়ে এতগুলো শিশুকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেন?
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, কাজটি অত্যন্ত কঠিন।
প্রাক-প্রাথমিকের শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল। তাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে কম। ফলে তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে শিক্ষককে বারবার কার্যক্রম পরিবর্তন করতে হয়, প্রত্যেক শিশুকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, দুর্বল বা অনাগ্রহী শিশুকে আলাদাভাবে উৎসাহিত করতে হয় এবং একই সঙ্গে পুরো শ্রেণির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় ধরে এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। আর শিক্ষক ক্লান্ত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিশুদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং সর্বোপরি কাঙ্ক্ষিত শিখনফলের ওপর।
তাই বিষয়টি শুধু শিক্ষকের কাজের চাপের প্রশ্ন নয়; এটি শিশুর শিক্ষার গুণগত মানের প্রশ্নও।
এক শিক্ষকনির্ভরতার আরেকটি বড় সমস্যা
বর্তমান ব্যবস্থার আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো—অনেক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম একজন নির্দিষ্ট প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।
তিনি কোনো কারণে ছুটিতে, প্রশিক্ষণে, সরকারি দায়িত্বে, অসুস্থতায় বা চিকিৎসা জনিত ছুটিতে থাকলে প্রাক-প্রাথমিকের কার্যক্রম অনেক সময় প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয় না। অন্য কোনো শিক্ষক শ্রেণি নিলেও তিনি যদি প্রাক-প্রাথমিকের বিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষিত না হন, তাহলে কার্যক্রমটি অনেক সময় মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয় না।
ফলে একটি শিশুর শিক্ষার ধারাবাহিকতায় সাময়িক হলেও বিঘ্ন ঘটে।
এখানে প্রশ্ন হলো—একটি বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন একজন নির্দিষ্ট শিক্ষকের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল থাকবে? একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তি নির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া উচিত।
সমাধান কী হতে পারে?
আমার বিবেচনায় এর একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে—প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ন্যূনতম দুইজন প্রাক-প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা।
এটি মানেই যে দুজন শিক্ষককে সবসময় একই সময়ে শ্রেণিকক্ষে থাকতে হবে—তা নয়। বরং দুজন শিক্ষক একটি সমন্বিত রুটিন তৈরি করে আড়াই ঘণ্টার কার্যক্রম ভাগ করে নিতে পারেন।
একজন শিক্ষক একটি নির্দিষ্ট অংশ পরিচালনা করবেন, অন্যজন পরবর্তী অংশ পরিচালনা করবেন। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু কার্যক্রম দুজন যৌথভাবে পরিচালনা করতে পারেন। এতে শিক্ষক একটানা দীর্ঘ সময়ের চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত থাকবেন এবং শিশুদের সঙ্গে আরও প্রাণবন্তভাবে কাজ করতে পারবেন।
এর ফলে শুধু শিক্ষকের চাপ কমবে না; বরং শিশুদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও বাড়বে।
খেলাধুলাকে শুধু ‘খেলা’ হিসেবে দেখলে চলবে না
প্রাক-প্রাথমিকের নির্দেশিত ও মুক্ত খেলা আসলে শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলতে খেলতেই শিশু সামাজিক আচরণ, যোগাযোগ, সহযোগিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান, শারীরিক সমন্বয় এবং আত্মবিশ্বাসের মতো নানা দক্ষতা অর্জন করে।
তাই খেলাধুলার সময় শিক্ষককে শুধু দূর থেকে নজরদারি করলেই হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে অংশগ্রহণ করতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে এবং শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
দুইজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলে এই কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল কী?
দুইজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে—
প্রথমত: শিক্ষকের ক্লান্তি কমবে এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কর্মদক্ষতা বাড়বে। দ্বিতীয়ত: একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও অন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন। তৃতীয়ত: শিশুদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। চতুর্থত: খেলাভিত্তিক ও শিশুকেন্দ্রিক কার্যক্রম আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। পঞ্চমত: দুইজন শিক্ষক পরস্পরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও যৌথ পরিকল্পনা করতে পারবেন। ষষ্ঠত: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; বরং বিদ্যালয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম হিসেবে শক্তিশালী হবে।
নতুন করে ভাবার সময় এসেছে
বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পর প্রায় এক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবু মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত শিখনফল পুরোপুরি অর্জন করতে পারছি?
যদি প্রত্যাশিত ফলাফল সর্বত্র সমানভাবে অর্জিত না হয়, তাহলে শুধু শিশুর শেখার সমস্যা বা শিক্ষকের দক্ষতাকে দায়ী না করে আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি, সময় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকসংখ্যা এবং শ্রেণি পরিচালনার কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে।
কারণ একটি ভালো কারিকুলাম তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি বাস্তবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
এখন প্রয়োজন একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ
এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি সারাদেশে পরিবর্তন আনার আগে নির্বাচিত কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে 'টু-ট্রেইন্ড-টিচার মডেল' পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে।
কয়েক মাস বা এক শিক্ষাবর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যেতে পারে— শিশুদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ছে; শিক্ষক ক্লান্তি কতটা কমছে; শ্রেণিকক্ষের পরিবেশের কী পরিবর্তন আসছে; খেলাভিত্তিক কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে; শিক্ষক অনুপস্থিতির সময় শ্রেণির ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকছে; এবং সর্বোপরি শিশুদের শিখনফলে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল ইতিবাচক হলে পর্যায়ক্রমে এটি বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
শেষ কথা
প্রাক-প্রাথমিক কোনো সাধারণ শ্রেণি নয়। এখানেই একটি শিশুর বিদ্যালয়ভীতি দূর হয়, শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তাই এই স্তরে বিনিয়োগ মানে শুধু বর্তমানের শিশুদের জন্য বিনিয়োগ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
একজন শিক্ষককে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা এককভাবে পুরো প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে আমরা হয়তো সময়সূচি পূরণ করতে পারি, কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি কাঙ্ক্ষিত মানের শিখনফল নিশ্চিত করতে পারছি?
সময়ের দাবি হলো বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা।
আমার প্রস্তাব খুব সরল—"ওয়ান স্কুল - ওয়ান ট্রেইন্ড প্রি-প্রাইমারি টিচার" থেকে আমাদের ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে—"ওয়ান স্কুল - এট লিস্ট টু ট্রেইন্ড প্রি-প্রাইমারি টিচার্স"। কারণ প্রাক-প্রাথমিকের লক্ষ্য শুধু একটি শ্রেণি পরিচালনা করা নয়; লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিশুর জন্য একটি আনন্দময়, নিরাপদ, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করা।
[লেখক: সহকারী শিক্ষক, নিশিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ]

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। এই পর্যায়ে শিশুকে শুধু বই পড়ানো নয়; বরং খেলাধুলা, গল্প, গান, ছবি, কথোপকথন, হাতে-কলমে কাজ এবং নানা ধরনের আনন্দময় কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়। তাই প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষকতা অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় আলাদা দক্ষতা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা ও শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি দাবি করে।
বর্তমান ব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে প্রায় আড়াই ঘণ্টার একটি দীর্ঘ ব্লকে প্রাক-প্রাথমিকের পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৩০ মিনিট নির্দেশিত খেলা ও মুক্ত খেলার জন্য নির্ধারিত থাকে। অনেকের কাছে এটি হয়তো 'খেলার সময়' মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে একজন শিক্ষকের জন্য এটিও যথেষ্ট দায়িত্বপূর্ণ সময়। কারণ শিশুদের খেলাধুলার সময়ও শিক্ষককে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হয়, প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা দিতে হয় এবং তাদের অংশগ্রহণে সহায়তা করতে হয়।
অর্থাৎ, আড়াই ঘণ্টার পুরো সময়টিই শিক্ষককে সক্রিয়ভাবে শিশুদের সঙ্গে থাকতে হয়।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—একজন শিক্ষক কি একটানা আড়াই ঘণ্টা একই মাত্রার শারীরিক ও মানসিক উদ্যম নিয়ে এতগুলো শিশুকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেন?
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, কাজটি অত্যন্ত কঠিন।
প্রাক-প্রাথমিকের শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল। তাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে কম। ফলে তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে শিক্ষককে বারবার কার্যক্রম পরিবর্তন করতে হয়, প্রত্যেক শিশুকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, দুর্বল বা অনাগ্রহী শিশুকে আলাদাভাবে উৎসাহিত করতে হয় এবং একই সঙ্গে পুরো শ্রেণির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় ধরে এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। আর শিক্ষক ক্লান্ত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিশুদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং সর্বোপরি কাঙ্ক্ষিত শিখনফলের ওপর।
তাই বিষয়টি শুধু শিক্ষকের কাজের চাপের প্রশ্ন নয়; এটি শিশুর শিক্ষার গুণগত মানের প্রশ্নও।
এক শিক্ষকনির্ভরতার আরেকটি বড় সমস্যা
বর্তমান ব্যবস্থার আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো—অনেক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম একজন নির্দিষ্ট প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।
তিনি কোনো কারণে ছুটিতে, প্রশিক্ষণে, সরকারি দায়িত্বে, অসুস্থতায় বা চিকিৎসা জনিত ছুটিতে থাকলে প্রাক-প্রাথমিকের কার্যক্রম অনেক সময় প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয় না। অন্য কোনো শিক্ষক শ্রেণি নিলেও তিনি যদি প্রাক-প্রাথমিকের বিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষিত না হন, তাহলে কার্যক্রমটি অনেক সময় মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয় না।
ফলে একটি শিশুর শিক্ষার ধারাবাহিকতায় সাময়িক হলেও বিঘ্ন ঘটে।
এখানে প্রশ্ন হলো—একটি বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন একজন নির্দিষ্ট শিক্ষকের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল থাকবে? একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তি নির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া উচিত।
সমাধান কী হতে পারে?
আমার বিবেচনায় এর একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে—প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ন্যূনতম দুইজন প্রাক-প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা।
এটি মানেই যে দুজন শিক্ষককে সবসময় একই সময়ে শ্রেণিকক্ষে থাকতে হবে—তা নয়। বরং দুজন শিক্ষক একটি সমন্বিত রুটিন তৈরি করে আড়াই ঘণ্টার কার্যক্রম ভাগ করে নিতে পারেন।
একজন শিক্ষক একটি নির্দিষ্ট অংশ পরিচালনা করবেন, অন্যজন পরবর্তী অংশ পরিচালনা করবেন। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু কার্যক্রম দুজন যৌথভাবে পরিচালনা করতে পারেন। এতে শিক্ষক একটানা দীর্ঘ সময়ের চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত থাকবেন এবং শিশুদের সঙ্গে আরও প্রাণবন্তভাবে কাজ করতে পারবেন।
এর ফলে শুধু শিক্ষকের চাপ কমবে না; বরং শিশুদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও বাড়বে।
খেলাধুলাকে শুধু ‘খেলা’ হিসেবে দেখলে চলবে না
প্রাক-প্রাথমিকের নির্দেশিত ও মুক্ত খেলা আসলে শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলতে খেলতেই শিশু সামাজিক আচরণ, যোগাযোগ, সহযোগিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান, শারীরিক সমন্বয় এবং আত্মবিশ্বাসের মতো নানা দক্ষতা অর্জন করে।
তাই খেলাধুলার সময় শিক্ষককে শুধু দূর থেকে নজরদারি করলেই হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে অংশগ্রহণ করতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে এবং শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
দুইজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলে এই কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল কী?
দুইজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে—
প্রথমত: শিক্ষকের ক্লান্তি কমবে এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কর্মদক্ষতা বাড়বে। দ্বিতীয়ত: একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও অন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন। তৃতীয়ত: শিশুদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। চতুর্থত: খেলাভিত্তিক ও শিশুকেন্দ্রিক কার্যক্রম আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। পঞ্চমত: দুইজন শিক্ষক পরস্পরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও যৌথ পরিকল্পনা করতে পারবেন। ষষ্ঠত: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; বরং বিদ্যালয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম হিসেবে শক্তিশালী হবে।
নতুন করে ভাবার সময় এসেছে
বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পর প্রায় এক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবু মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত শিখনফল পুরোপুরি অর্জন করতে পারছি?
যদি প্রত্যাশিত ফলাফল সর্বত্র সমানভাবে অর্জিত না হয়, তাহলে শুধু শিশুর শেখার সমস্যা বা শিক্ষকের দক্ষতাকে দায়ী না করে আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি, সময় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকসংখ্যা এবং শ্রেণি পরিচালনার কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে।
কারণ একটি ভালো কারিকুলাম তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি বাস্তবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
এখন প্রয়োজন একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ
এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি সারাদেশে পরিবর্তন আনার আগে নির্বাচিত কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে 'টু-ট্রেইন্ড-টিচার মডেল' পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে।
কয়েক মাস বা এক শিক্ষাবর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যেতে পারে— শিশুদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ছে; শিক্ষক ক্লান্তি কতটা কমছে; শ্রেণিকক্ষের পরিবেশের কী পরিবর্তন আসছে; খেলাভিত্তিক কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে; শিক্ষক অনুপস্থিতির সময় শ্রেণির ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকছে; এবং সর্বোপরি শিশুদের শিখনফলে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল ইতিবাচক হলে পর্যায়ক্রমে এটি বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
শেষ কথা
প্রাক-প্রাথমিক কোনো সাধারণ শ্রেণি নয়। এখানেই একটি শিশুর বিদ্যালয়ভীতি দূর হয়, শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তাই এই স্তরে বিনিয়োগ মানে শুধু বর্তমানের শিশুদের জন্য বিনিয়োগ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
একজন শিক্ষককে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা এককভাবে পুরো প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে আমরা হয়তো সময়সূচি পূরণ করতে পারি, কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি কাঙ্ক্ষিত মানের শিখনফল নিশ্চিত করতে পারছি?
সময়ের দাবি হলো বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা।
আমার প্রস্তাব খুব সরল—"ওয়ান স্কুল - ওয়ান ট্রেইন্ড প্রি-প্রাইমারি টিচার" থেকে আমাদের ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে—"ওয়ান স্কুল - এট লিস্ট টু ট্রেইন্ড প্রি-প্রাইমারি টিচার্স"। কারণ প্রাক-প্রাথমিকের লক্ষ্য শুধু একটি শ্রেণি পরিচালনা করা নয়; লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিশুর জন্য একটি আনন্দময়, নিরাপদ, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করা।
[লেখক: সহকারী শিক্ষক, নিশিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ]

আপনার মতামত লিখুন