সংবাদ

ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ‘খুনি-ধর্ষকদের’ ঘরবাড়ি


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০০ পিএম

ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ‘খুনি-ধর্ষকদের’ ঘরবাড়ি
পাবনা সদরে অভিযুক্ত ধর্ষকের দ্বিতল ভবন হাতুড়ি, শাবল দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা

দেশে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার চেয়ে সাধারণ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে কোনো এলাকায় চাঞ্চল্যকর খুন বা ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরপরই আসামিদের বাড়িঘরে গণহামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে।

সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই ‘গণমব’ পরিস্থিতি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় ধরনের সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও এই মব কালচার বা গণ-আদালত বসানোর হিড়িক থামানো যাচ্ছে না।

বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন জেলায় এমন ঘটনায় দেখা যায়, আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও উত্তেজিত জনতা তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি বেছে নিয়েছে।

সর্বশেষ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভোলার চরফ্যাশনে ফোনে ডেকে নেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া বসার পন্ডিত (৩৫) নামে এক যুবকের পেট কাটা ও গলায় দাগ থাকা ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই চরফ্যাশনের নজরুল নগর ইউনিয়নে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা একত্রিত হয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় সাহিদুর রহমান ও সালমা বেগমের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। উত্তেজিত জনতা সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দক্ষিণ আইচা থানা-পুলিশ ওই সন্দেহভাজন দম্পতিকে আটক করে।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে মামলার প্রধান আসামি ইসহাকের বাড়িতে হামলা চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। যাতে ঘরে থাকা আসবাবপত্র ও মালামাল পুড়ে যায়।

এরপর গত ৩ জুন পাবনা সদর উপজেলায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া খাতুনকে (১৫) ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের জেরে উত্তেজিত জনতা আসামিদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়। সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে তিন জনের মৃত্যু হয়।

পাবনা সদরে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে গত ১৮ সেপ্টেম্বর। সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামে ১০ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার প্রধান আসামির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জুমার নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাশের বাড়ির মোস্তফার বাড়িতে চড়াও হয়ে হাতুড়ি, শাবল দিয়ে দ্বিতল বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।

ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২১ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর দশমিনায় এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যার খবর এলাকায় পৌঁছালে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা অভিযুক্ত স্বামীর গ্রামের বাড়িতে দলবদ্ধভাবে হামলা ও ভাঙচুর চালান।

পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এক নারীকে তার সন্তানকে জিম্মি করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের একটি রোমহর্ষক ঘটনা সামনে আসে। ঘটনার পর ভুক্তভোগী মামলা করলেও স্থানীয় উত্তেজিত জনতা মামলার প্রধান আসামিসহ চারজন অভিযুক্তের বসতবাড়িতে একযোগে অতর্কিত হামলা চালায়। ব্যাপক ভাঙচুর শেষে ঘরগুলোতে পেট্রোল বা দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে আসামিদের চারটি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমাজ ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আস্থার সংকট আর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।

কোনো এলাকায় ধর্ষণ বা খুনের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটলে সাধারণ মানুষ মনে করে, আইনি মারপ্যাঁচে বা রাজনৈতিক প্রভাবে হয়তো অপরাধী পার পেয়ে যাবে কিংবা বিচার হতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। এই তাৎক্ষণিক হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই মানুষ নিজেই বিচারক সেজে রায় কার্যকর করতে রাস্তায় নেমে পড়ে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব ও উসকানিমূলক পোস্টও এই মব তৈরি করতে আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ‘খুনি-ধর্ষকদের’ ঘরবাড়ি

প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার চেয়ে সাধারণ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে কোনো এলাকায় চাঞ্চল্যকর খুন বা ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরপরই আসামিদের বাড়িঘরে গণহামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে।

সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই ‘গণমব’ পরিস্থিতি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় ধরনের সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও এই মব কালচার বা গণ-আদালত বসানোর হিড়িক থামানো যাচ্ছে না।

বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন জেলায় এমন ঘটনায় দেখা যায়, আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও উত্তেজিত জনতা তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি বেছে নিয়েছে।

সর্বশেষ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভোলার চরফ্যাশনে ফোনে ডেকে নেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া বসার পন্ডিত (৩৫) নামে এক যুবকের পেট কাটা ও গলায় দাগ থাকা ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই চরফ্যাশনের নজরুল নগর ইউনিয়নে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা একত্রিত হয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় সাহিদুর রহমান ও সালমা বেগমের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। উত্তেজিত জনতা সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দক্ষিণ আইচা থানা-পুলিশ ওই সন্দেহভাজন দম্পতিকে আটক করে।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে মামলার প্রধান আসামি ইসহাকের বাড়িতে হামলা চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। যাতে ঘরে থাকা আসবাবপত্র ও মালামাল পুড়ে যায়।

এরপর গত ৩ জুন পাবনা সদর উপজেলায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া খাতুনকে (১৫) ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের জেরে উত্তেজিত জনতা আসামিদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়। সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে তিন জনের মৃত্যু হয়।

পাবনা সদরে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে গত ১৮ সেপ্টেম্বর। সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামে ১০ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার প্রধান আসামির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জুমার নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাশের বাড়ির মোস্তফার বাড়িতে চড়াও হয়ে হাতুড়ি, শাবল দিয়ে দ্বিতল বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।

ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২১ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর দশমিনায় এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যার খবর এলাকায় পৌঁছালে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা অভিযুক্ত স্বামীর গ্রামের বাড়িতে দলবদ্ধভাবে হামলা ও ভাঙচুর চালান।

পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এক নারীকে তার সন্তানকে জিম্মি করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের একটি রোমহর্ষক ঘটনা সামনে আসে। ঘটনার পর ভুক্তভোগী মামলা করলেও স্থানীয় উত্তেজিত জনতা মামলার প্রধান আসামিসহ চারজন অভিযুক্তের বসতবাড়িতে একযোগে অতর্কিত হামলা চালায়। ব্যাপক ভাঙচুর শেষে ঘরগুলোতে পেট্রোল বা দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে আসামিদের চারটি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমাজ ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আস্থার সংকট আর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।

কোনো এলাকায় ধর্ষণ বা খুনের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটলে সাধারণ মানুষ মনে করে, আইনি মারপ্যাঁচে বা রাজনৈতিক প্রভাবে হয়তো অপরাধী পার পেয়ে যাবে কিংবা বিচার হতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। এই তাৎক্ষণিক হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই মানুষ নিজেই বিচারক সেজে রায় কার্যকর করতে রাস্তায় নেমে পড়ে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব ও উসকানিমূলক পোস্টও এই মব তৈরি করতে আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত