ভারতের রাজনীতিতে বর্তমান সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ কর্মসূচি এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মতবিরোধের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে রাজনৈতিক মহল।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা এবং নতুন ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। এমনকি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। একটি ঘটনায় তারা এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকেও চিঠি লিখেছিলেন। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরই বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করে সোচ্চার হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক হাঙ্গামা। নির্বাচন কমিশনের দাবি, মৃত, অযোগ্য ও একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে প্রায় ২৫ বছর পর তালিকা হালনাগাদ করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। কিন্তু বিরোধী দল ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের অভিযোগ, ভোটারদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য জন্ম, জমি বা শিক্ষার পুরোনো নথি চাওয়া হচ্ছে, যা প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেকের পক্ষেই দেখানো সম্ভব নয়। নথির সামান্য অমিল বা বানানের ভুলেও তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ছে। সারা দেশে প্রায় ১৩ কোটি এবং শুধু পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় ৩০ লাখ নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে এসেছে। বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এজন্য সরাসরি নরেন্দ্র মোদি সরকারকে দায়ী করেছেন এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও গ্রেফতারের পাশাপাশি রাজ্যে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর কঠোর অবস্থানে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভোট চুরির মতো গুরুতর ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলেছেন।
তার দাবি, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কারচুপির যথেষ্ট তথ্য তার কাছে রয়েছে এবং ভোট চুরি সরাসরি সংবিধানের ওপর আঘাত। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই শুক্রবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও অধিকারকর্মী যোগেন্দ্র যাদবের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিক্ষোভে অংশ নিয়ে এসআইআর কর্মসূচি বাতিলের দাবি জানান। দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয় এবং ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এসআইআর প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ মতবিরোধকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে দাবি করেছে।
বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র জানান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে মূলত অবৈধ অভিবাসী ও ভুয়া ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা বদলে এখন নাগরিকদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা ভারতের নির্বাচনি গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার ওপর আস্থার বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। গেজেট ও বাস্তবায়নের নানা প্রক্রিয়া এবং আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই বিতর্ক এখন কেবল তালিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকেই বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভারতের রাজনীতিতে বর্তমান সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ কর্মসূচি এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মতবিরোধের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে রাজনৈতিক মহল।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা এবং নতুন ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। এমনকি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। একটি ঘটনায় তারা এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকেও চিঠি লিখেছিলেন। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরই বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করে সোচ্চার হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক হাঙ্গামা। নির্বাচন কমিশনের দাবি, মৃত, অযোগ্য ও একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে প্রায় ২৫ বছর পর তালিকা হালনাগাদ করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। কিন্তু বিরোধী দল ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের অভিযোগ, ভোটারদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য জন্ম, জমি বা শিক্ষার পুরোনো নথি চাওয়া হচ্ছে, যা প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেকের পক্ষেই দেখানো সম্ভব নয়। নথির সামান্য অমিল বা বানানের ভুলেও তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ছে। সারা দেশে প্রায় ১৩ কোটি এবং শুধু পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় ৩০ লাখ নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে এসেছে। বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এজন্য সরাসরি নরেন্দ্র মোদি সরকারকে দায়ী করেছেন এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও গ্রেফতারের পাশাপাশি রাজ্যে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর কঠোর অবস্থানে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভোট চুরির মতো গুরুতর ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলেছেন।
তার দাবি, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কারচুপির যথেষ্ট তথ্য তার কাছে রয়েছে এবং ভোট চুরি সরাসরি সংবিধানের ওপর আঘাত। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই শুক্রবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও অধিকারকর্মী যোগেন্দ্র যাদবের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিক্ষোভে অংশ নিয়ে এসআইআর কর্মসূচি বাতিলের দাবি জানান। দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয় এবং ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এসআইআর প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ মতবিরোধকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে দাবি করেছে।
বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র জানান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে মূলত অবৈধ অভিবাসী ও ভুয়া ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা বদলে এখন নাগরিকদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা ভারতের নির্বাচনি গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার ওপর আস্থার বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। গেজেট ও বাস্তবায়নের নানা প্রক্রিয়া এবং আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই বিতর্ক এখন কেবল তালিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকেই বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন