রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার অলিগলিতে কিংবা মেট্রো রেলের পিলারের নিচে তাকালেই চোখে পড়ে অসংখ্য ছিন্নমূল শিশু, যাদের দেখভাল করার মতো কোনো মা-বাবা বা অভিভাবক নেই।
এ সব
সুবিধাবঞ্চিত শিশু খারাপ সংস্পর্শে
পড়ে দিন দিন আরও
অন্ধকার ও বিপদের পথে
এগিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই
সুস্থ ও স্বাভাবিক এবং
একটি শিক্ষিত জীবনযাপন করতে চাইলেও মূলত
একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কারণে তা আর পেরে
ওঠে না।
২০২৪
সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রকাশিত একটি বিশেষ গবেষণামূলক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে
বর্তমানে ৩৪ লাখের বেশি
শিশু কোনো ধরনের পারিবারিক
যত্ন বা অভিভাবকহীন অবস্থায়
রাস্তায় জীবন অতিবাহিত করছে।
এসব শিশুর একটি বিশাল অংশ
ক্ষুধা, একাকীত্ব ও তীব্র হতাশা
থেকে বাঁচতে জুতার আঠা বা ড্যান্ডি
এবং অন্যান্য মাদকের ভয়ংকর শিকারে পরিণত হচ্ছে।
নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশু আমাদের
এই প্রতিবেদককে জানায়, ওদের জোর করে
ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয় এবং কোনো
ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতে অস্বীকৃতি
জানালে নানা ধরনের ভয়ভীতি
দেখানো হয়।
শিশুটির
বর্ণনা অনুযায়ী, কেউ তাদের কথা
মতো না চললে তাকে
নির্মমভাবে শারীরিক আঘাত করা হয়
এবং অনেক সময় ধারালো
ব্লেড বা অস্ত্রও ব্যবহার
করা হয়। যার প্রমাণ মেলে ওই শিশুদের হাত ও
পায়ের দিকে তাকালেই। এমনকি
ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হয় না, কারণ
শিশুর চেহারা মলিন ও ক্ষুধার্ত
দেখালে সাধারণ মানুষের মনে সহজেই দয়া
হয় এবং ভিক্ষা পাওয়া
সহজ হয়।
পাশে
থাকা আরেক শিশু জানায়,
আঘাতের তীব্র ব্যথা ও প্রচণ্ড ক্ষুধা
সহ্য করার ক্ষমতা অর্জনের
জন্য এই চক্রটি শিশুদের
এক ধরনের ভয়ংকর মাদকে (জুতার আঠা ড্যান্ডি বা প্যাস্টিংয়ে) অভ্যস্ত
করে তোলে।
মতিঝিল
এলাকায় মেট্রো রেলের নিচে এমন কিছু
শিশুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে
পাশেই তাদের নেতৃত্ব দেওয়া এক তরুণ বড়
ইট হাতে নিয়ে সংবাদের
এই প্রতিবেদককে মারতে উদ্যত হয়।
এমনই নির্মম
ঘটনা ঘটে কিশোর রায়হানের
সাথে। অভিমান করে
ঘর ছেড়ে ৭ মাস
ধরে নিখোঁজ থাকা ১২ বছরের
কিশোর মোহাম্মদ রায়হান যখন স্বজনদের কাছে
ফিরে এল, তখন তার
ডান পা কেটে ফেলা
হয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন
স্থানে ক্ষতের দাগ রয়েছে।
জানা
যায়, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকায় সিরাত মাহফিল থেকে ভিক্ষা করার
সময় স্থানীয়দের সহায়তায় রায়হানকে উদ্ধার করে তার পরিবার।
রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী
চক্র তাকে ঢাকার কমলাপুরে
আটকে রেখে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে
নামায়। পানি বিক্রি করে
প্রত্যাশিত আয় না হওয়ায়
অধিক অর্থ উপার্জনের জন্য
চেতনাাশক খাইয়ে তার ডান পা
কেটে পঙ্গু করে দেওয়া হয়।
ওই সময় রায়হান
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানায়, বাড়ি
থেকে বের হয়ে কক্সবাজার
সৈকতে থাকার পর এক ব্যক্তি
তাকে বেশি টাকা উপার্জনের
প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে যায়। কমলাপুর
রেলস্টেশনের কাছে গাছপালা ঘেরা
একটি টিনের ঘরে তাকে রাখা
হতো, যেখানে আরও অনেক শারীরিক
প্রতিবন্ধী শিশু ছিল।
সে জানায়, "এক দিন রাতে
আমাকে পানি বা শরবতের
সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন
করা হয়। সকালে ঘুম
থেকে উঠে দেখি আমার
ডান পা নেই।"
পা কাটার পর তাকে হুইলচেয়ারে
বসিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করানো হতো এবং দিনে
প্রাপ্ত দেড় থেকে দুই
হাজার টাকা চক্রটি কেড়ে
নিত। পরবর্তী সময়ে একজন তাকে বাসে তুলে চট্টগ্রাম
পাঠিয়ে দিলে সে স্বজনদের
কাছে ফিরে আসে।
সুস্থ-সবল ছেলেকে পঙ্গু
অবস্থায় ফেরত পেয়ে চরম
বিপর্যস্ত রায়হানের পরিবার। পেটে কাটার দাগ
দেখে কিডনি চুরি হয়েছে কি
না তা পরীক্ষার জন্য
তাকে লোহাগাড়া হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে চিকিৎসকরা
জানান তার কিডনি নিরাপদ
আছে। রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন
ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার
সুস্থ-সবল ছেলেকে পঙ্গু
করে দেওয়া হয়েছে। তার ডান পা
কেটে ফেলেছে। পেটের ডান পাশে ও
পেছনেও ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সত্য উদঘাটন
ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।"
রায়হানের
চাচা মো. নুরুচ্ছফা অপরাধীদের
শাস্তি দাবি করে বলেন,
"এটা শুধু আমার ভাতিজার
বিষয় নয়। এ ধরনের
ঘটনা যেন আর কোনো
শিশুর সঙ্গে না ঘটে, সেটিও
নিশ্চিত করতে হবে। আমরা
পুরো চক্রের বিচার চাই।"
পথশিশু
ও ছিন্নমূল শিশুদের ড্যান্ডিসহ মারাত্মক মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক অভিভাবকহীনতার
সংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফ সর্বদা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আগে সুরক্ষা দেওয়ার
নীতিতে জোরালো অবস্থান প্রকাশ করে আসছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক
জরুরি শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর মূল অবস্থান ও মূল্যায়ণ অনুযায়ী, সুরক্ষার অধিকার থেকে
চরমভাবে বঞ্চিত হয়ে রাস্তায় থাকা শিশুরা কেবল মাদকের ভয়াবহ জগতে জড়াচ্ছে না, বরং নিয়মিত
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর 'Children Living
in Street Situations 2024' শীর্ষক রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, অধিকাংশ শিশুই মূলত
চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাতের কারণে
নিজেদের বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়। অভিভাবকহীন এই একাকী জীবনের গভীর মানসিক
ট্রমা ও হতাশা ভুলতেই তারা ভুল সঙ্গদোষে পড়ে খুব কম বয়সেই জুতার আঠার মতো মারাত্মক মারণ মাদকে আসক্ত হয়ে
নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
ব্যুরোর (বিবিএস) সাবেক মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমান বলেন, “বিবিএস সব সময় জাতির
প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনায় রেখে
সময়ানুগ ও নির্ভরযোগ্য সরকারি
পরিসংখ্যান প্রস্তুতে কাজ করে যাচ্ছে।
এ ধরনের জরিপ কার্যক্রম বিবিএসের
সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। নিয়মিত বিভিন্ন শুমারির পাশাপাশি এ ধরনের চাহিদাভিত্তিক
জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিবিএস সবসময় ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আগ্রহী।”
সোশ্যাল
অ্যান্ড ইকোনমিক এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশই বর্তমানে
মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত। প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদার অভাবে চরম জীবনসংগ্রামে লিপ্ত থাকা
এই শিশুদের ৪১ শতাংশের ঘুমানোর ন্যূনতম কোনো বিছানা নেই এবং ৪০ শতাংশ শিশু নিয়মিত গোসল
করার মতো সুবিধাও পায় না। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনের মৌলিক উপাদান না থাকায় ৩৫ শতাংশ পথশিশু
বাধ্য হয়ে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও সম্পূর্ণভাবে
উপেক্ষিত, কারণ অসুস্থ হলে ৫৪ শতাংশ শিশুর সেবাযত্ন করার কেউ থাকে না এবং ৭৫ শতাংশ
শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা সঠিক চিকিৎসা নিতে পারে
না। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার মতো
মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এসব
পথশিশুর করুণ এই দুরবস্থার
জন্য মূলত আমাদের সমাজ
ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতাই দায়ী।
প্রয়োজনীয়
পদক্ষেপ: ‘সংবাদের বিশ্লেষণ’
সরকার ও ব্যক্তিগত
স্থান থেকে শুধু পরিসংখ্যানের থেমে না থেকে প্রয়োজন পদক্ষেপ গ্রহণ। দেশের বিপুল সংখ্যক ছিন্নমূল ও পথশিশুর নিরাপদ
ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ
জোরদার প্রয়োজন। শিশুদের নিরাপদ আবাসন, মাদক থেকে মুক্তি
এবং সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ও বেসরকারি শেল্টার
হোম বা আশ্রয় কেন্দ্রের
সংখ্যা বাড়ানো অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
এসব
আশ্রমে শিশুরা নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি জীবনের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা পেতে হবে। সাধারণ নিরাময় কেন্দ্রগুলো শিশুদের বয়সের উপযোগী না হওয়ায় শিশুদের
শারীরিক ও মানসিক বিশেষত্ব
বিবেচনা করে ডেডিকেটেড ‘চাইল্ড
ডিটক্সিফিকেশন ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’
স্থাপন করা জরুরী।
পাশাপশি
ট্রমা ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার
কারণে মানসিক জটিলতা দূর করার জন্য পেশাদার সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথাগত
শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত এই
শিশুদের জন্য তাদের জীবনযাত্রার
সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহজ ও আনন্দময়
অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পথ সুগম করার
প্রতি জোর দেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের বয়স ও আগ্রহ
অনুযায়ী হস্তশিল্প, অটোমেকানিক্স, কম্পিউটার অপারেটিং কিংবা দর্জি ও বিজ্ঞানের মতো নানামুখী কারিগরি
ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রদান করা গেলে তারা
পরবর্তী জীবনে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারবে।
এসব বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেবল তাদের অর্থনৈতিকভাবে
স্বাবলম্বীই করবে না, বরং
সমাজ গড়ার কাজেও তাদের
উৎপাদনশীল অবদান নিশ্চিত করবে।
ছিন্নমূল
শিশুদের অপরাধ ও মাদকের হাত
থেকে রক্ষা করতে জুতার আঠা
বা ডেন্ড্রাইটের মতো রাসায়নিক পদার্থের
অননুমোদিত এবং ক্ষতিকর ব্যবহার
বন্ধে স্থানীয় দোকানদার ও আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
যেসব অসাধু অপরাধী চক্র এসব অসহায়
পথশিশুকে ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা,
চুরি বা অন্যান্য অপরাধমূলক
কর্মকাণ্ড করাচ্ছে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির
ব্যবস্থা করতে হবে।
একই
সাথে ছিন্নমূল শিশুদের প্রতি সাধারণ নাগরিকদের সহানুভূতিশীল হওয়া এবং সমাজের
প্রতিটি স্তরে সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে
এদের সুস্থ সুন্দর জীবন গঠনে সবাইকে
একযোগে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
সব মিলিয়ে,
মৌলিক সুযোগ-সুবিধার চরম অভাব ও সার্বিক সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে
পথশিশুদের এই চলমান মানবিক দুরবস্থা নিরসনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ এখন
সময়ের দাবি।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার অলিগলিতে কিংবা মেট্রো রেলের পিলারের নিচে তাকালেই চোখে পড়ে অসংখ্য ছিন্নমূল শিশু, যাদের দেখভাল করার মতো কোনো মা-বাবা বা অভিভাবক নেই।
এ সব
সুবিধাবঞ্চিত শিশু খারাপ সংস্পর্শে
পড়ে দিন দিন আরও
অন্ধকার ও বিপদের পথে
এগিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই
সুস্থ ও স্বাভাবিক এবং
একটি শিক্ষিত জীবনযাপন করতে চাইলেও মূলত
একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কারণে তা আর পেরে
ওঠে না।
২০২৪
সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রকাশিত একটি বিশেষ গবেষণামূলক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে
বর্তমানে ৩৪ লাখের বেশি
শিশু কোনো ধরনের পারিবারিক
যত্ন বা অভিভাবকহীন অবস্থায়
রাস্তায় জীবন অতিবাহিত করছে।
এসব শিশুর একটি বিশাল অংশ
ক্ষুধা, একাকীত্ব ও তীব্র হতাশা
থেকে বাঁচতে জুতার আঠা বা ড্যান্ডি
এবং অন্যান্য মাদকের ভয়ংকর শিকারে পরিণত হচ্ছে।
নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশু আমাদের
এই প্রতিবেদককে জানায়, ওদের জোর করে
ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয় এবং কোনো
ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতে অস্বীকৃতি
জানালে নানা ধরনের ভয়ভীতি
দেখানো হয়।
শিশুটির
বর্ণনা অনুযায়ী, কেউ তাদের কথা
মতো না চললে তাকে
নির্মমভাবে শারীরিক আঘাত করা হয়
এবং অনেক সময় ধারালো
ব্লেড বা অস্ত্রও ব্যবহার
করা হয়। যার প্রমাণ মেলে ওই শিশুদের হাত ও
পায়ের দিকে তাকালেই। এমনকি
ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হয় না, কারণ
শিশুর চেহারা মলিন ও ক্ষুধার্ত
দেখালে সাধারণ মানুষের মনে সহজেই দয়া
হয় এবং ভিক্ষা পাওয়া
সহজ হয়।
পাশে
থাকা আরেক শিশু জানায়,
আঘাতের তীব্র ব্যথা ও প্রচণ্ড ক্ষুধা
সহ্য করার ক্ষমতা অর্জনের
জন্য এই চক্রটি শিশুদের
এক ধরনের ভয়ংকর মাদকে (জুতার আঠা ড্যান্ডি বা প্যাস্টিংয়ে) অভ্যস্ত
করে তোলে।
মতিঝিল
এলাকায় মেট্রো রেলের নিচে এমন কিছু
শিশুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে
পাশেই তাদের নেতৃত্ব দেওয়া এক তরুণ বড়
ইট হাতে নিয়ে সংবাদের
এই প্রতিবেদককে মারতে উদ্যত হয়।
এমনই নির্মম
ঘটনা ঘটে কিশোর রায়হানের
সাথে। অভিমান করে
ঘর ছেড়ে ৭ মাস
ধরে নিখোঁজ থাকা ১২ বছরের
কিশোর মোহাম্মদ রায়হান যখন স্বজনদের কাছে
ফিরে এল, তখন তার
ডান পা কেটে ফেলা
হয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন
স্থানে ক্ষতের দাগ রয়েছে।
জানা
যায়, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকায় সিরাত মাহফিল থেকে ভিক্ষা করার
সময় স্থানীয়দের সহায়তায় রায়হানকে উদ্ধার করে তার পরিবার।
রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী
চক্র তাকে ঢাকার কমলাপুরে
আটকে রেখে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে
নামায়। পানি বিক্রি করে
প্রত্যাশিত আয় না হওয়ায়
অধিক অর্থ উপার্জনের জন্য
চেতনাাশক খাইয়ে তার ডান পা
কেটে পঙ্গু করে দেওয়া হয়।
ওই সময় রায়হান
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানায়, বাড়ি
থেকে বের হয়ে কক্সবাজার
সৈকতে থাকার পর এক ব্যক্তি
তাকে বেশি টাকা উপার্জনের
প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে যায়। কমলাপুর
রেলস্টেশনের কাছে গাছপালা ঘেরা
একটি টিনের ঘরে তাকে রাখা
হতো, যেখানে আরও অনেক শারীরিক
প্রতিবন্ধী শিশু ছিল।
সে জানায়, "এক দিন রাতে
আমাকে পানি বা শরবতের
সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন
করা হয়। সকালে ঘুম
থেকে উঠে দেখি আমার
ডান পা নেই।"
পা কাটার পর তাকে হুইলচেয়ারে
বসিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করানো হতো এবং দিনে
প্রাপ্ত দেড় থেকে দুই
হাজার টাকা চক্রটি কেড়ে
নিত। পরবর্তী সময়ে একজন তাকে বাসে তুলে চট্টগ্রাম
পাঠিয়ে দিলে সে স্বজনদের
কাছে ফিরে আসে।
সুস্থ-সবল ছেলেকে পঙ্গু
অবস্থায় ফেরত পেয়ে চরম
বিপর্যস্ত রায়হানের পরিবার। পেটে কাটার দাগ
দেখে কিডনি চুরি হয়েছে কি
না তা পরীক্ষার জন্য
তাকে লোহাগাড়া হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে চিকিৎসকরা
জানান তার কিডনি নিরাপদ
আছে। রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন
ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার
সুস্থ-সবল ছেলেকে পঙ্গু
করে দেওয়া হয়েছে। তার ডান পা
কেটে ফেলেছে। পেটের ডান পাশে ও
পেছনেও ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সত্য উদঘাটন
ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।"
রায়হানের
চাচা মো. নুরুচ্ছফা অপরাধীদের
শাস্তি দাবি করে বলেন,
"এটা শুধু আমার ভাতিজার
বিষয় নয়। এ ধরনের
ঘটনা যেন আর কোনো
শিশুর সঙ্গে না ঘটে, সেটিও
নিশ্চিত করতে হবে। আমরা
পুরো চক্রের বিচার চাই।"
পথশিশু
ও ছিন্নমূল শিশুদের ড্যান্ডিসহ মারাত্মক মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক অভিভাবকহীনতার
সংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফ সর্বদা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আগে সুরক্ষা দেওয়ার
নীতিতে জোরালো অবস্থান প্রকাশ করে আসছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক
জরুরি শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর মূল অবস্থান ও মূল্যায়ণ অনুযায়ী, সুরক্ষার অধিকার থেকে
চরমভাবে বঞ্চিত হয়ে রাস্তায় থাকা শিশুরা কেবল মাদকের ভয়াবহ জগতে জড়াচ্ছে না, বরং নিয়মিত
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর 'Children Living
in Street Situations 2024' শীর্ষক রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, অধিকাংশ শিশুই মূলত
চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাতের কারণে
নিজেদের বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়। অভিভাবকহীন এই একাকী জীবনের গভীর মানসিক
ট্রমা ও হতাশা ভুলতেই তারা ভুল সঙ্গদোষে পড়ে খুব কম বয়সেই জুতার আঠার মতো মারাত্মক মারণ মাদকে আসক্ত হয়ে
নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
ব্যুরোর (বিবিএস) সাবেক মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমান বলেন, “বিবিএস সব সময় জাতির
প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনায় রেখে
সময়ানুগ ও নির্ভরযোগ্য সরকারি
পরিসংখ্যান প্রস্তুতে কাজ করে যাচ্ছে।
এ ধরনের জরিপ কার্যক্রম বিবিএসের
সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। নিয়মিত বিভিন্ন শুমারির পাশাপাশি এ ধরনের চাহিদাভিত্তিক
জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিবিএস সবসময় ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আগ্রহী।”
সোশ্যাল
অ্যান্ড ইকোনমিক এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশই বর্তমানে
মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত। প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদার অভাবে চরম জীবনসংগ্রামে লিপ্ত থাকা
এই শিশুদের ৪১ শতাংশের ঘুমানোর ন্যূনতম কোনো বিছানা নেই এবং ৪০ শতাংশ শিশু নিয়মিত গোসল
করার মতো সুবিধাও পায় না। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনের মৌলিক উপাদান না থাকায় ৩৫ শতাংশ পথশিশু
বাধ্য হয়ে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও সম্পূর্ণভাবে
উপেক্ষিত, কারণ অসুস্থ হলে ৫৪ শতাংশ শিশুর সেবাযত্ন করার কেউ থাকে না এবং ৭৫ শতাংশ
শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা সঠিক চিকিৎসা নিতে পারে
না। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার মতো
মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এসব
পথশিশুর করুণ এই দুরবস্থার
জন্য মূলত আমাদের সমাজ
ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতাই দায়ী।
প্রয়োজনীয়
পদক্ষেপ: ‘সংবাদের বিশ্লেষণ’
সরকার ও ব্যক্তিগত
স্থান থেকে শুধু পরিসংখ্যানের থেমে না থেকে প্রয়োজন পদক্ষেপ গ্রহণ। দেশের বিপুল সংখ্যক ছিন্নমূল ও পথশিশুর নিরাপদ
ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ
জোরদার প্রয়োজন। শিশুদের নিরাপদ আবাসন, মাদক থেকে মুক্তি
এবং সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ও বেসরকারি শেল্টার
হোম বা আশ্রয় কেন্দ্রের
সংখ্যা বাড়ানো অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
এসব
আশ্রমে শিশুরা নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি জীবনের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা পেতে হবে। সাধারণ নিরাময় কেন্দ্রগুলো শিশুদের বয়সের উপযোগী না হওয়ায় শিশুদের
শারীরিক ও মানসিক বিশেষত্ব
বিবেচনা করে ডেডিকেটেড ‘চাইল্ড
ডিটক্সিফিকেশন ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’
স্থাপন করা জরুরী।
পাশাপশি
ট্রমা ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার
কারণে মানসিক জটিলতা দূর করার জন্য পেশাদার সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথাগত
শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত এই
শিশুদের জন্য তাদের জীবনযাত্রার
সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহজ ও আনন্দময়
অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পথ সুগম করার
প্রতি জোর দেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের বয়স ও আগ্রহ
অনুযায়ী হস্তশিল্প, অটোমেকানিক্স, কম্পিউটার অপারেটিং কিংবা দর্জি ও বিজ্ঞানের মতো নানামুখী কারিগরি
ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রদান করা গেলে তারা
পরবর্তী জীবনে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারবে।
এসব বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেবল তাদের অর্থনৈতিকভাবে
স্বাবলম্বীই করবে না, বরং
সমাজ গড়ার কাজেও তাদের
উৎপাদনশীল অবদান নিশ্চিত করবে।
ছিন্নমূল
শিশুদের অপরাধ ও মাদকের হাত
থেকে রক্ষা করতে জুতার আঠা
বা ডেন্ড্রাইটের মতো রাসায়নিক পদার্থের
অননুমোদিত এবং ক্ষতিকর ব্যবহার
বন্ধে স্থানীয় দোকানদার ও আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
যেসব অসাধু অপরাধী চক্র এসব অসহায়
পথশিশুকে ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা,
চুরি বা অন্যান্য অপরাধমূলক
কর্মকাণ্ড করাচ্ছে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির
ব্যবস্থা করতে হবে।
একই
সাথে ছিন্নমূল শিশুদের প্রতি সাধারণ নাগরিকদের সহানুভূতিশীল হওয়া এবং সমাজের
প্রতিটি স্তরে সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে
এদের সুস্থ সুন্দর জীবন গঠনে সবাইকে
একযোগে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
সব মিলিয়ে,
মৌলিক সুযোগ-সুবিধার চরম অভাব ও সার্বিক সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে
পথশিশুদের এই চলমান মানবিক দুরবস্থা নিরসনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ এখন
সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন