নওশাদ নূরীর কবিতা
অনুবাদ: হাইকেল হাশমী
উপসংহার
আমার অস্তিত্বের পাথর, আর জীবনের গাঁইতি—
আমার বিবেক, আর দিন রাত পর্বত-ভাঙার শ্রম।
এটাই তো সেই শিল্প, যাকে মানুষ কবিতা বলে—
নকশাকারি সব ঋণী আত্ম-ভাঙনের কাছে;
আমার অস্তিত্ব থেকে হীরা তুলে আনে,
আমার ক্ষীণ দৃষ্টি, আমার বাঁকা বচন।
এই স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিকে যদি বলা হয় বিপদ,
তবে আমার ঠোঁটে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা সংগত।
যদি সময় ও স্থানের অনুমানগুলো হয় ভুল
তবে আমার মনের প্রদীপগুলোর হত্যা সংগত।
যদি আমি সকল রাসূলের অগ্রগামী হই,
তবে আমার সত্তার ঈশ্বরের সম্মান সংগত।
আমার অস্তিত্বের ছেনি, আর আকাঙ্ক্ষার পল্লব;
আমার বিবেকের পাথর, আর হৃদয়ের দর্পণ।
আমার অস্তিত্ব আমার প্রতিটি অন্বেষণে বাধা;
আমার বিবেক আমার প্রতিটি ভাবনায় অন্তরায়।
আমার অস্তিত্ব সারা বিশ্বের শোকের মূলধন;
আমার বিবেক আমার অস্তিত্বের সারাংশ।
আমার ভাবনা, কেবল তোমার প্রতিক্রিয়া
আমার উন্মাদনা, কেবল তোমার উপসংহার।
বিস্ফোরণ
কোকিলেরা নীরব, পাপিয়ারাও স্তব্ধ—
সুর, সুরের আরাধ্য দেবী, আজ কোথায়?
রাত যেন স্তব্ধ, দিন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর—
বল তো, সঙ্গীতের সেই অপ্সরা আজ কোথায়?
চাঁদের সাথে আজ সব চকোর পাখির বিরাগ,
মৃদু সমীরণেও লজ্জিত চাঁদের আলো।
ফুলে ঢাকা ঋতুতে আর কতকাল দেখব
রাতের এমন মৃত্যু, দিনের এমন মৃত্যুযন্ত্রণা?
কোকিলেরা নীরব, পাপিয়ারাও স্তব্ধ।
তবু আবার এক উল্লম্ফন, একটি গান আর সুরের তরঙ্গ—
সূর্যের মুখে থুথু ছুড়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে রাত,
কিন্তু অন্ধকারই তো ভোরের আগমনের পূর্বলক্ষণ।
এক ক্ষতবিক্ষত শিশুর
নিস্তব্ধ রাত্রিতে ‘মা, মা’ বলে চিৎকার—
সেই আর্তনাদই যেন বিজয় ও মুক্তির পথনির্দেশ।
তবে নবজাগ্রত বিশ্বের কাফেলা কোথায়?
প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার পথে
প্রতিটি লাশই যেন এক একটি মাইলফলক।
(১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লেখা কবিতা)
ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই
নিস্তব্ধতা আর কথোপকথনের মাঝে—
পলায়ন আর বিতারনের এই মধুর যন্ত্রণা।
গোধূলির রঙ তাকে আরও কিছুদিন ঢেকে রাখুক
নবোদিত কুঁড়ির সহ্য হয় না এত তীব্র উজ্জ্বলতা।
বুদবুদের প্রকৃতিকে দেয় মোলায়েম স্পর্শ
ফুলকে দেয় শুভ্র বাতাস আর শিশিরকে জ্যোৎস্না।
একজন ভাস্কর, লোহার তীক্ষ্ণ ছেনি থাকা সত্ত্বেও,
পাহাড় খনন করে ফেলে, কোনো যন্ত্র ছাড়া।
বর্ণহীণ গোপন রেখাগুলো মুখমণ্ডলের ত্বকের নিচে
সেই রেখাগুলো নিজেই জেগে উঠে নিঃশব্দ কপালে।
সন্ধ্যার সমীরণের বুক থাকুক না আর কিছু দিন স্থির
প্রিয়তমের ঢং ছাড়া সে কি নিজেও পায় পূর্ণতা।
এই প্রেমের কারণেই হারিয়েছি মান সম্মান
এই প্রেমই তো করেছে নিঃশ্বাসকে মুক্ত,
শালীনতা, নীরবতা, ভয় আর ভদ্রতার
একমাত্র আশ্রয়কে করে দিয়েছে ধ্বংস,
জেগে থাকলে তার স্মৃতি এসে ঘুম পাড়িয়ে যায়
আর ঘুমালে, তার স্বপ্ন এসে ঘুম ভাঙ্গিয়ে যায়।
এই স্বপ্ন আর কল্পনার স্বয়ংক্রিয় ধারাবাহিকতা
এই আত্মচেতনার যন্ত্রণার নীরব ধাপগুলো,
ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে—
ক্ষত আর নখের মাঝের দূরত্ব।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
নওশাদ নূরীর কবিতা
অনুবাদ: হাইকেল হাশমী
উপসংহার
আমার অস্তিত্বের পাথর, আর জীবনের গাঁইতি—
আমার বিবেক, আর দিন রাত পর্বত-ভাঙার শ্রম।
এটাই তো সেই শিল্প, যাকে মানুষ কবিতা বলে—
নকশাকারি সব ঋণী আত্ম-ভাঙনের কাছে;
আমার অস্তিত্ব থেকে হীরা তুলে আনে,
আমার ক্ষীণ দৃষ্টি, আমার বাঁকা বচন।
এই স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিকে যদি বলা হয় বিপদ,
তবে আমার ঠোঁটে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা সংগত।
যদি সময় ও স্থানের অনুমানগুলো হয় ভুল
তবে আমার মনের প্রদীপগুলোর হত্যা সংগত।
যদি আমি সকল রাসূলের অগ্রগামী হই,
তবে আমার সত্তার ঈশ্বরের সম্মান সংগত।
আমার অস্তিত্বের ছেনি, আর আকাঙ্ক্ষার পল্লব;
আমার বিবেকের পাথর, আর হৃদয়ের দর্পণ।
আমার অস্তিত্ব আমার প্রতিটি অন্বেষণে বাধা;
আমার বিবেক আমার প্রতিটি ভাবনায় অন্তরায়।
আমার অস্তিত্ব সারা বিশ্বের শোকের মূলধন;
আমার বিবেক আমার অস্তিত্বের সারাংশ।
আমার ভাবনা, কেবল তোমার প্রতিক্রিয়া
আমার উন্মাদনা, কেবল তোমার উপসংহার।
বিস্ফোরণ
কোকিলেরা নীরব, পাপিয়ারাও স্তব্ধ—
সুর, সুরের আরাধ্য দেবী, আজ কোথায়?
রাত যেন স্তব্ধ, দিন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর—
বল তো, সঙ্গীতের সেই অপ্সরা আজ কোথায়?
চাঁদের সাথে আজ সব চকোর পাখির বিরাগ,
মৃদু সমীরণেও লজ্জিত চাঁদের আলো।
ফুলে ঢাকা ঋতুতে আর কতকাল দেখব
রাতের এমন মৃত্যু, দিনের এমন মৃত্যুযন্ত্রণা?
কোকিলেরা নীরব, পাপিয়ারাও স্তব্ধ।
তবু আবার এক উল্লম্ফন, একটি গান আর সুরের তরঙ্গ—
সূর্যের মুখে থুথু ছুড়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে রাত,
কিন্তু অন্ধকারই তো ভোরের আগমনের পূর্বলক্ষণ।
এক ক্ষতবিক্ষত শিশুর
নিস্তব্ধ রাত্রিতে ‘মা, মা’ বলে চিৎকার—
সেই আর্তনাদই যেন বিজয় ও মুক্তির পথনির্দেশ।
তবে নবজাগ্রত বিশ্বের কাফেলা কোথায়?
প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার পথে
প্রতিটি লাশই যেন এক একটি মাইলফলক।
(১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লেখা কবিতা)
ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই
নিস্তব্ধতা আর কথোপকথনের মাঝে—
পলায়ন আর বিতারনের এই মধুর যন্ত্রণা।
গোধূলির রঙ তাকে আরও কিছুদিন ঢেকে রাখুক
নবোদিত কুঁড়ির সহ্য হয় না এত তীব্র উজ্জ্বলতা।
বুদবুদের প্রকৃতিকে দেয় মোলায়েম স্পর্শ
ফুলকে দেয় শুভ্র বাতাস আর শিশিরকে জ্যোৎস্না।
একজন ভাস্কর, লোহার তীক্ষ্ণ ছেনি থাকা সত্ত্বেও,
পাহাড় খনন করে ফেলে, কোনো যন্ত্র ছাড়া।
বর্ণহীণ গোপন রেখাগুলো মুখমণ্ডলের ত্বকের নিচে
সেই রেখাগুলো নিজেই জেগে উঠে নিঃশব্দ কপালে।
সন্ধ্যার সমীরণের বুক থাকুক না আর কিছু দিন স্থির
প্রিয়তমের ঢং ছাড়া সে কি নিজেও পায় পূর্ণতা।
এই প্রেমের কারণেই হারিয়েছি মান সম্মান
এই প্রেমই তো করেছে নিঃশ্বাসকে মুক্ত,
শালীনতা, নীরবতা, ভয় আর ভদ্রতার
একমাত্র আশ্রয়কে করে দিয়েছে ধ্বংস,
জেগে থাকলে তার স্মৃতি এসে ঘুম পাড়িয়ে যায়
আর ঘুমালে, তার স্বপ্ন এসে ঘুম ভাঙ্গিয়ে যায়।
এই স্বপ্ন আর কল্পনার স্বয়ংক্রিয় ধারাবাহিকতা
এই আত্মচেতনার যন্ত্রণার নীরব ধাপগুলো,
ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে—
ক্ষত আর নখের মাঝের দূরত্ব।

আপনার মতামত লিখুন