প্লুং বাঁশির সুরে ম্রো কান্না
মাতৃভাষা জানে, তবে তারা জানে না কথিত ভদ্রভাষা
মুখোশ নগর থেকে তাদের দূরত্ব যোজন যোজন মাইল
তোমাদের শালীনতাসূচকে তারা তলার মানুষ
বন-পাহাড়ে প্রজাপতি মনে ঘুরে বেড়ানো জীবন|
তারা গাছ চিনে, ফুল পাখি শস্য চিনে, পতঙ্গও বন্ধু
প্রাণির হিংস্রতা নিয়ে ভাবে না, জ্ঞাতি মানে
মিথোজীবিতায় যাপন করে অরণ্যজীবন|
তারা আদিম, আদিবাসী, তারা অরণ্য সোদর
পাতাবর্ণে বুঝে নেয়ে শ্রাবণ নাকি ফাগুন!
বিনোদন নিতে অরণ্যে যেতে চাই
অথচ বানাই নিরাপত্তা দালান;
ইটের স্তূপ, কয়লার বারবিকিউ, শব্দদূষণ!
বন ফুরায়, পাখি সরে, সবুজ উধাও, ঘাস মরে
ফুলও বিবর্ণ হয়ে ঝরে যায় অকালে!
অরণ্য হারালে ফুসফুসের ক্ষত কে সারাবে বলো?
তোমরা যারা পরিপাটি জন, তোমাদের জানাতে চাই প্লুং এ উচ্চারিত বেদনার বয়ান;
“আমার মুখের জবান বইপুস্তকে নেই
আমার অবাধ বিচরণ পাহাড় ঝরনায়
আমার পূর্বপুরুষ জুমে গেছে উঁচুনিচু পথে
আমার পায়ে পশুচামড়ার জুতা নেই
আমাদের হাতে দা আর পিঠে রাখি থুরং
আমরা নিত্যদিন জোগাড় করি পেটের আহার
আমাদের সিন্দুক নেই, ব্যাংক লকার কিছু নেই,
আমাদের বেহিসাবি উপার্জন নেই, ঘুষ-দুর্নীতির জমানো টাকা নেই যেখানে ভয় জড়িত
আত্মসাৎ করি না পরদ্রব্য বরং বছর বছর আত্মসাৎ হলো আমাদের ফসলী জমি তোমাদের মুখোশে
আমাদের আর কী আছে? বসতভিটা, বাপদাদার কবর ছাড়া?
তাতেও তোমাদের লোভ!
তোমরা আমাদের উদ্বাস্তু করে উপভোগ করবে অরণ্যজীবন?
আমরা ঘর হারিয়ে পর হবো তোমাদের তারকা বিলাসে?
অরণ্যে বসতি আমার, পাহাড় আমার মা, বৃক্ষ আমার ভাই, ঝরনা আমার বোন
জ্ঞাতী পরিজন কেড়ে নিলে কেউ কোনদিন ভালো থাকে কি?
যেহেতু তোমরা আমার ভাষা-আর্তনাদ কিছুই বুঝো না
তাই প্লুং বাঁশির সুরে বলে যাই
আমাদের মনোবেদনার কথা;
চিম্বুক-নাইতং পাহাড়ের ম্রোদের জীবনগাথা|”
ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই
আমি শ্বাস নিতে পারছি না!
ধীরে ধীরে কালো চোখে আঁধার কালো
সাদা কাফনে মৃতদেহ কালোই রইলো|
করোনাকালে বন্ধ জানালায় বেশি অন্ধকার
সাদা মৃত্যু হয়তো পাবে সাদারা
কিন্তু মৃত্যুর কালোরূপ দেখতে দেখতে চলে গেলেন জর্জ ফ্লয়েড
সারা পৃথিবীতে এই মৃত্যু সাদা কাগজে কালো দাগ!
তারা কি দেশের জন্য পথে নামেনি?
তারা কি দশের স্বার্থে কোন কাজ করেনি?
কৃষ্ণাঙ্গের কোন অবদান তুমি অস্বীকার করবে?
কৃষ্ণাঙ্গের রক্তস্রোত মিসিসিপি পেরিয়ে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে
তবুও লালধারা সাদা হয় না?
কালোর রক্তক্ষরণ হতে হতে এখন বাকি সাদা রক্তরস;
তবে কি কালোরঙে সাদার সূচনা?
না, না, তারা চায় না সাদা রঙ
সাদা চামড়া বড়ই হারামিতে ভরা!
সাদামাটা ঘটনাটা দেখলে মনে হয়
জর্জের বেঁচে থাকার কথা;
অথচ সাদা হাঁটুর চাপে শ্বাসকষ্টে মারা গেলো
এমন অপমানে মনুষ্যত্ব মুখ লুকায় সংবেদী বেদনায়!
অক্সিজেন কমে গেলে মানুষের ঠোঁট-নাক হয় কালো
কিন্তু জর্জের কালোরঙে বোঝা যায়নি কিছুই,
জর্জের মিনতি কে শোনে?
ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই
ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই
জানতো না জর্জ, উর্দির নিচে লুকিয়ে আছে নীলরক্তের সাদা শরীর!
শিশু জিয়ানা জানে না, কালো চামড়ায় জন্মালে বাবাকে হারাতে হয়
বাবার জীবন কেড়ে নিলো সাদার হাঁটু
মা মা চিৎকার, কার কানে যায়?
কালোর গোঙানি কতদূর যায় যখন শ্বাসনালি জব্দ!
কালোদের চোখের জল কি কালো?
কালোদের রক্তের রঙ কি কালো?
কালোদের মুখে কি কালো ভাষা?
কালোদের ভালোবাসা কি কালোয় ভরা?
কেউ বলে না উত্তর!
সবায় দর্শক বৈষম্যের আর্তনাদে
সবায় নির্বাক যখন গলায় আটকানো চাপ
ক্ষমতা মমতাহীন, মানুষে মানুষে ফারাক
ক্ষমতা বাদুড় বানায়, দিনে দেখে না, রাতে ফোটে চোখ|
আমারে বাঁচতে দাও, আমার জিয়ানার বয়স মাত্র ছয়
কন্যাকে যে হাতে আদর করেছি সকালে
তা পিছমোড়া করে বেঁধেছো কেন?
বাবা বাবা বলে যে ঘাড়ে লাফিয়ে উঠতো মেয়ে
তা হাঁটু দিয়ে চেপে ভেঙে দিচ্ছো কেন?
তবে মেয়েকে কোথায় রাখবো ঘুরে বেড়ানোর কালে?
আমারে বাঁচতে দাও, শ্বাস নিতে দাও
দয়া করো, ‘আই কান্ট ব্রিদ’
আই কান্ট...
আমি ধরতে চাই জিয়ানার হাত
আয় খুকী আয়...
কালোদের অপরাধ কালো রঙ
সাদাদের অহংকার জন্মের
কোথাও মানুষ নেই, কেউ সাদা কেউ কালো!
কোথাও মানুষ নেই, কেউ উঁচু কেউ নিচু!
কোথাও মানুষ নেই, কারো আছো কারো নেই!
ভাগাভাগি ˆবষম্য আকাশপাতাল |
অনেকে ভেবেছিলো ঘুচে যাবে ব্যবধান মহামারীকালে
নতুন পৃথিবী হবে সমব্যথী মনে
হয়তো হিসেবে ভুল; হয়তো পরিণতি মৃত্যু
এমনও হতে পারে মৃত্যুতেই মুছে যাবে মানুষের ভেদাভেদ!
পাতাজন্ম ও ঝরা পাতা
পাতা জন্মাতে দেখিনি; পাতা ঝরা দেখেছি
ঝরাপাতার রঙ কী? ক্ষয়ে যাওয়া অবশেষ
বনের গভীরে যারা যায় তারা চিনে
রঙ নেয়া ঝরাপাতা|
ঝরাপাতা উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে আসে
পড়ে থাকে মাটিলগ্ন, নিজের খেয়ালে
প্রজাপতি সঙ্গে উড়ে;
উড়ে উড়ে প্রজাপতি কই যায়?
প্রজাপতির ঘর কই?
পাতারা সংলগ্ন থাকে মায়ের বুকে
প্রজাপতি উড়ে এসে ঠোঁটে দেয় চুমু
ঝরাপাতা উড়ে হয় প্রজাপতি সখা...
কখনো পাতা হয় প্রজাপতি পাখা
কখনো পাখা হয় রঙ করা পাতা
মিলে যায় অবলীলায় অদৃশ্য লীলায়
শরীর নিখোঁজ হয় চেতনা গভীরে...
কারও জন্ম পথে-ঘাটে, কারও ঘর নেই
দেখা হয় অকারণে, কারণও খোঁজে
পাতা জন্মাতে দেখিনি;
চারা বের হলে পড়ে থাকে বীজের খোলস...
পাতা ঝরার দিন
পথও স্মৃতির মতো স্থির হয়ে থাকে প্রিয়জন হারালে
বসন্তে কোকিল ডাকে অথচ তখনও বৃক্ষের পাতা ঝরে
আমের মুকুল ঘ্রাণ সুরভিত কথা নিয়ে ফিরে
জীবন জলসায় করুণ সুরে বাজে অতীত সানাই!
পথ অবিকল, তবে প্রতিবেশী বৃক্ষরা কিছুটা প্রবীণ
নামফলক নেই, কারা থাকে এ ঘরে এখন?
আমরাও ছিলাম একদা এখানে, কথাটা বলবো;
যখনই হাজির হই ছবির কাছে কিংবা সাক্ষাতে!
কামিনী ফুলের গাছটা কই? চড়ুইপাখির কিচিরমিচির!
প্রকৌশলে অপসৃত বহু আগে, পাখি আর আসে না ভোরে
বিদ্যুৎ এর তারে কাক বসে, ডাকে, কুহু কদাচিৎ শুনি
পরিচিত চিহ্ন সামনে এলে স্মৃতি ফিরে অনুষঙ্গসহ...
ঝরাপাতার গায়ে পা পড়লেই বেজে ওঠে সমাপ্তির গান!
শীতের মায়া বেশি
জড়াজড়ি ওমে কেটে যায় রাত
শূন্য অনুভব যার সে জানে শীতের বিরহ!
সকালের লেপ্টে থাকা রোদ চেষ্টায় সরে না
শরীর, উঠোন, পথে লেগে থাকে আলিঙ্গন
বোঝাপড়া বাড়ে কুয়াশার ঘেরে নিঃসঙ্গ সড়কে
অস্পষ্টতাও অধিক শীতের সন্ধ্যায়
উষ্ণতার খোঁজে ভালোবাসা গতিশীল স্রোত;
যেভাবে জড়াতে চায়, অনেকটা কুয়াশার জট!
যেখানে মায়ার ডাক,
সেখানে অস্পষ্ট ছায়া থাকে নাকি?
কারও কারও শীতে ভয়;
দূরের যাত্রায় শংকা নিয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে থাকে
মুখে ধোঁয়া ওঠা তবুও থামে না!
শীতপর্ব শেষ কবে?
পরিমাপ করে প্রবাহিত মৌসুমি বায়ুর তেজ
যত শীত তত গান পর্যটক দলে
সুরে ভয় পায় শীত, সুরে রোদ, সুরে বেগ বাড়ে পায়ে
কর্মযাত্রায় আলস্য পেলে আবেগে জড়ায় শীত!
শীতের সকালে শুয়ে শুয়ে,
মন্ত্রোচ্চারণের মতো যদি মোটা ¯^রে বলা যায়;
তোমাকেই ভালোবাসি খুব,
তবে অনুভূত হয় মনোতলে গভীরতা...
জানা যতোটুকু অজানা অধিক
সবই সঠিক কিনা জানি না;
তবুও সময়ে বোঝা যায় মনোযোগ, অভিযোগ!
এক এক করে দূরে সরে যায় অনেকে...
নিজের জন্মবৃত্তান্তে লিখি মাতামুহুরীর নাম
বিনামারা গ্রাম রয়ে যায়, যায় না কোথাও
আমারে আঁকড়ে ধরে, আমিও জড়িয়ে
বাহিত রক্তকণিকা পরিচয় বলে...
একসময় যারা ছিল পাটাতন, দাঁড়াবো
ক্ষয়ে নুয়ে গেছে কিছুদিন পরে; চলমান স্রোত
আয়নায় মুখ আসে অপসৃত ছায়ায়
বেলা পড়ে এলে আলো কমে কমে
কালো কালো রেখা...
যতোদূর হাঁটা পথ ততোটুকু জানা, অজানাই বেশি
স্বরূপে চিহ্নিত হয় দূরে সরে গেলে
কতোটুকু কাছে গেলে আগুন অচেনা?
কতোটুকু দূরে গেলে আমিও অজানা!
জানি, নদীও মনে রাখে না দূরত্বের পথ
শুধু লুকিং-গ্লাস জানে কার হাসি কার ছায়া!
হারানো অনুভব
শুরুতেই কান্না, বিদায়েও কান্না
মাঝের শূন্যতা জুড়ে আনন্দ-বেদনা!
সুন্দরের আয়ু কম, যেমন গোলাপ ঝরে
সুখ ক্ষণিকের তারপর মরীচিকা খেলা!
প্রস্ফুটিত ফুলের সৌন্দর্যে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রজাপতিও জানে পাপড়ি ঝরে যাবে নিজস্ব নিয়মে
কান্নার প্রকাশ যেন বরফখণ্ডের পানিতে ভাসার মতো
অবস্থিতি তলে অধিক...
তোমাকে বোঝাতে পারিনি তাই অশ্রুই ভরসা
মুহূর্ত হারিয়ে গেলে ফেরানো মুশকিল!
পথ সরে গেলে দেখা নেই, হারানো অনুভব...
ফেনাদাগ
সমুদ্রের ফেনারেখা কুলের দিকে যায়;
সমস্ত অনুভব-উত্তেজনা কুণ্ডলী পাকিয়ে!
আমিও আশ্রয় নিই আকাঙ্ক্ষিত মনোচরে
জানি, কোনকিছুই বেশিক্ষণ থাকে না কাছে
যেমন তরঙ্গ সমুদ্রচরে
যেমন তীরকেও ছেড়ে দেয় ধনুক...
মুহূর্ত সমর্পণ করে পরবর্তী ধাপে
তবুও
প্রতিটি ঢেউ রেখে যায় কিছু ফেনাদাগ...
স্মারকচিহ্ন
কুহু ডাক শুনতে শুনতে আমিও একদিন
ফাগুনে পাতা ঝরার মতো ঝরে যাবো
একই পথে তুমি ও তোমরা হেঁটে যাবে
তারপরে তোমাদের বংশধর...
এক একটি চিহ্ন নিয়ে পথে পথে স্মারক!
আগমন হেতু জানি না, জানি চলমান ধারা
স্মৃতি, স্বর, অবয়ব ক্ষয়ে যায়, রয়ে যায় পথ
কথাসব মিশে যায় ধূলিময় ঘাসে|
ফসিল হয়ে যদি নামফলক উন্মোচিত হয়
তবে মনে পড়বে, মুখোমুখি খণ্ডিত অতীত!
ছায়া অবয়ব
ঘর হতে বের হলে ঘরে ফেরা যায় না আর!
পরিজন ঘরে ফিরে, জনাবৃত্তে কথা আর ছবি তার
কুশলে জানার ছিল বিবিধ বিষয়, বাকি থাকে!
শেষ কথা প্রতিধ্বনি দেয়ালে খেয়ালে অথচ নীরব
শ্বাস ছেড়ে গেলে ঘর লাগে কি আর? পুরোটাই ঘর
নিশ্বাস নিয়েছি বহু, চিৎকারেও থাকে না কেউ শেষে
শ্বাস ছেড়ে গেলে আশ বাড়ে নাকি? আশ্বাস অশেষ...!
জীবনের জয় নাকি পরাজয়, অহেতুক তর্ক চলে
সম্পর্কের আঁকা রেখা বাঁকা-সোজা, খোঁজে না কারণ
পাশাপাশি যাত্রাপথ ভিন্ন মত নিয়ে অভিমান অভিযোগ
একসময় থামে, নাই কোলাহল, কোনো কথা নেই,
অমাবস্যা নাকি?
ঘরের ঠিকানা ঠিক, মানচিত্রে বেদখল ঘর,
ফেরা হলো না আর!
বিনা নোটিশে যারা ছেড়ে যায় তাদের খোঁজ নিতে হয় পথে
সীমানা পর্যন্ত অভিকর্ষ টান তারপর পরিভ্রমণ শূন্যে...
হাতের ইশারা নেই চোখের নিশানা নেই কোথাও পরিধি নেই
লোকালয়ে জমা কথা ঘুমচোখে জেগে ওঠে,
জানায় একদা ছিলাম তোমাদের মাঝে...
কে যেন বললো পথে, আয়ুরেখা ধরে ঘরে যেতে হয়
কার ঘর? কোন ঘর? ঘর চেনা মুশকিল বিষম সময়ে
একদা আকুতি ছিল, মিনতি করেছি বহু, এখন নীরব
যার যার মতো ফিরে যায় ঘরে, পড়ে থাকে ছায়া অবয়ব
মধ্যবর্তী
দূরসমস্তকুয়াশায় ঘেরা তবুও অবয়বে বোঝা যায়
তবুও মনে হয় আছে
তবুও মনে হয় ছোঁয়া যাবে
ডাক দিলে সাড়া দিবে সহসাই!
মাঝখানে যেসব পরম্পরা ক্রমশ স্পষ্ট হয়
কখনও গাঢ়ত্ব বাড়ে,কখনও বদলায় রঙ,পা বাড়ানো রূপান্তর
সমবেত আয়োজন-গুঞ্জরণ কিংবা পরিপূর্ণতার মরীচিকা
যুগল প্রজাপতির দৌড়, আগে পিছে এলোমেলো খেলা
যত অবয়ব গড়া মনে স্বনির্মিত কারুকাজ
অনুভবে অনুবাদ যুক্তিতে সংশয়
দূর পথ ধরে হেঁটে গেলে দূরত্ব কমে কি?
ফিরে ফিরে খোঁজে হিসাবের কতকিছু আনন্দ-বেদনার|
গম্ভীর বেদনা
অস্থায়ী আনন্দ ঘিরে অচিন বাতাস
নীরবে আঁধার আসে,ফিরে যায় মুখ
দলাপাকানো বেদনা স্বয়ংক্রিয় পথে...
কুণ্ডলী পাকানো আলো,পরিধিতে ঘিরে থাকা কালো
নির্ঘুম রাতের কথা গম্ভীর গহীন
ভর বেড়ে গেলে জ্বর,তারপর পোড়ানো অগ্নি;
ছাই জমা থাকে তার|
শীতল বাতাসে কেন মন কাঁদে?
রোদে জায়মান বোধ
বৈশাখের অর্ধনগ্ন বনে
বিক্ষিপ্ত ভাবনা শুকাতে দিয়েছি রোদে
তীব্র তাপদাহে শীতল বাতাস চায় মন
প্রশান্তির খোঁজে পাশে জলাশয়,
চিকচিক করে জলের উপরিতল
এমন দুপুর নীরবে হাজির ঘাসের ওপর|
স্মৃতি এক প্রলম্বিত ছায়া
বেলা বুঝে বাড়ে-কমে, ফিরিয়ে দেয় পুরাঘটিত অতীত
দাগী কথা মনে পড়ে, বাকিসব উড়ে গেছে দশা-ঘষা কালে
রোদের হাহাকারে আমিও তৃষ্ণার্ত বেদুঈন
পুশকার মরু পার হই তুমি লক্ষবিন্দু
ফনিমনসার পাশেই রক্তাভ গোলাপ, ভ্রমণপথের চিহ্ন
পথই বহন করে যাবতীয়অনুভব...
তবুও পথ চিনে না পথিক;
শুধু পথিক মনে রাখতে চায় পথের বাঁক
ঝলসানো রোদে বেশিদূর দেখা যায় না
কপাল কুঁচকে চোখের পাতায় টেনে আনি পথ
এক একটা পথ এক একটা প্রতীক এক একটা গল্প
পথ হারালে মনে পড়ে চেনা পথের বয়ান...
রোদ উঁচু হতে হতে দেয়াল হয়,
বারান্দায় বিস্তারিত রোদের শরীর
আবদ্ধ হয়ে বসে থাকি রোদে পোড়া ঘরে...
রোদের প্রাবল্য থেমে গেলে পরিশ্রান্ত গোধূলির ছায়া!
ঘোরলাগা টান
বালিশের নিচে রাখা অগোছালো অনুভব
হলুদ খামের চিঠি,সযত্নে গোপন
দৈনিক হিসাব-নিকাশ, বিমর্ষ সময়ের ফাঁকে
উঁকি মারে তরঙ্গিত শব্দ, ভালোবাসি|
বিনিদ্র রাতের কথা, স্বগতোক্তি, জীবন্ত কল্পনা
স্পষ্ট হয় প্রহরে প্রহরে, ঘোরলাগা টান
কথোপকথনে রেশ থাকে শেষ হলেও
তৃষা জাগে শুধু দেখা হোক
দেখা হলে বলা হয় না আর বেশি!
ভালোবাসলে বুক মোচড়ানো ছাড়ে না অস্থির বাদক!
বালিশের কাছে সংরক্ষিত থাকে আনন্দ-বেদনা
গোপনীয় কক্ষে যত্নে জমা শব্দগুলো ঢেউ তোলে
চরে স্পষ্ট করে চিহ্ন, ভিন্ন ভিন্ন সময়ের অনুনাদ
একা হলে ভিড় করে মুখ, চোখ, কথা, হাসি, চিঠির আবেগ
ভাসমান
ভ্রমণের পথ ভাঙে নদীর ঢেউ
এগিয়ে যায় কুয়াশা ডিঙিয়ে
লক্ষবিন্দু দূরে অথচ নাগালে
বাতাসের বেগে ছুটে যায় মন...
যত কথা মনের সঙ্গে জলের সঙ্গে
বিস্তারিত আকাশের গায়ে সারাংশ লিখে
অসার ভেবেও ভাসি, ভালোবাসি আশপাশ
শ্বাস ঘন হলে রেশ কেটে যায়, আমিও ভাসমান কচুরিপানা
জড়িয়ে থাকার কালে মনে পড়ে জুড়ানো সময়
ডায়েরির পাতা জুড়ে চিহ্ন, প্রতিবিম্ব জেগে রয়
কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া নব্বইয়ের দশকের বিশিষ্ট কবি। তিনি ১৯৬৯ সালের ১৫ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানার বিনামারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’, ‘নদীর নিজস্ব ঘ্রাণ’, ‘লাভলেইন’, ‘জ্বর ও নজর’ প্রভৃতি। বসবাস: চট্টগ্রাম জেলায়।

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্লুং বাঁশির সুরে ম্রো কান্না
মাতৃভাষা জানে, তবে তারা জানে না কথিত ভদ্রভাষা
মুখোশ নগর থেকে তাদের দূরত্ব যোজন যোজন মাইল
তোমাদের শালীনতাসূচকে তারা তলার মানুষ
বন-পাহাড়ে প্রজাপতি মনে ঘুরে বেড়ানো জীবন|
তারা গাছ চিনে, ফুল পাখি শস্য চিনে, পতঙ্গও বন্ধু
প্রাণির হিংস্রতা নিয়ে ভাবে না, জ্ঞাতি মানে
মিথোজীবিতায় যাপন করে অরণ্যজীবন|
তারা আদিম, আদিবাসী, তারা অরণ্য সোদর
পাতাবর্ণে বুঝে নেয়ে শ্রাবণ নাকি ফাগুন!
বিনোদন নিতে অরণ্যে যেতে চাই
অথচ বানাই নিরাপত্তা দালান;
ইটের স্তূপ, কয়লার বারবিকিউ, শব্দদূষণ!
বন ফুরায়, পাখি সরে, সবুজ উধাও, ঘাস মরে
ফুলও বিবর্ণ হয়ে ঝরে যায় অকালে!
অরণ্য হারালে ফুসফুসের ক্ষত কে সারাবে বলো?
তোমরা যারা পরিপাটি জন, তোমাদের জানাতে চাই প্লুং এ উচ্চারিত বেদনার বয়ান;
“আমার মুখের জবান বইপুস্তকে নেই
আমার অবাধ বিচরণ পাহাড় ঝরনায়
আমার পূর্বপুরুষ জুমে গেছে উঁচুনিচু পথে
আমার পায়ে পশুচামড়ার জুতা নেই
আমাদের হাতে দা আর পিঠে রাখি থুরং
আমরা নিত্যদিন জোগাড় করি পেটের আহার
আমাদের সিন্দুক নেই, ব্যাংক লকার কিছু নেই,
আমাদের বেহিসাবি উপার্জন নেই, ঘুষ-দুর্নীতির জমানো টাকা নেই যেখানে ভয় জড়িত
আত্মসাৎ করি না পরদ্রব্য বরং বছর বছর আত্মসাৎ হলো আমাদের ফসলী জমি তোমাদের মুখোশে
আমাদের আর কী আছে? বসতভিটা, বাপদাদার কবর ছাড়া?
তাতেও তোমাদের লোভ!
তোমরা আমাদের উদ্বাস্তু করে উপভোগ করবে অরণ্যজীবন?
আমরা ঘর হারিয়ে পর হবো তোমাদের তারকা বিলাসে?
অরণ্যে বসতি আমার, পাহাড় আমার মা, বৃক্ষ আমার ভাই, ঝরনা আমার বোন
জ্ঞাতী পরিজন কেড়ে নিলে কেউ কোনদিন ভালো থাকে কি?
যেহেতু তোমরা আমার ভাষা-আর্তনাদ কিছুই বুঝো না
তাই প্লুং বাঁশির সুরে বলে যাই
আমাদের মনোবেদনার কথা;
চিম্বুক-নাইতং পাহাড়ের ম্রোদের জীবনগাথা|”
ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই
আমি শ্বাস নিতে পারছি না!
ধীরে ধীরে কালো চোখে আঁধার কালো
সাদা কাফনে মৃতদেহ কালোই রইলো|
করোনাকালে বন্ধ জানালায় বেশি অন্ধকার
সাদা মৃত্যু হয়তো পাবে সাদারা
কিন্তু মৃত্যুর কালোরূপ দেখতে দেখতে চলে গেলেন জর্জ ফ্লয়েড
সারা পৃথিবীতে এই মৃত্যু সাদা কাগজে কালো দাগ!
তারা কি দেশের জন্য পথে নামেনি?
তারা কি দশের স্বার্থে কোন কাজ করেনি?
কৃষ্ণাঙ্গের কোন অবদান তুমি অস্বীকার করবে?
কৃষ্ণাঙ্গের রক্তস্রোত মিসিসিপি পেরিয়ে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে
তবুও লালধারা সাদা হয় না?
কালোর রক্তক্ষরণ হতে হতে এখন বাকি সাদা রক্তরস;
তবে কি কালোরঙে সাদার সূচনা?
না, না, তারা চায় না সাদা রঙ
সাদা চামড়া বড়ই হারামিতে ভরা!
সাদামাটা ঘটনাটা দেখলে মনে হয়
জর্জের বেঁচে থাকার কথা;
অথচ সাদা হাঁটুর চাপে শ্বাসকষ্টে মারা গেলো
এমন অপমানে মনুষ্যত্ব মুখ লুকায় সংবেদী বেদনায়!
অক্সিজেন কমে গেলে মানুষের ঠোঁট-নাক হয় কালো
কিন্তু জর্জের কালোরঙে বোঝা যায়নি কিছুই,
জর্জের মিনতি কে শোনে?
ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই
ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই
জানতো না জর্জ, উর্দির নিচে লুকিয়ে আছে নীলরক্তের সাদা শরীর!
শিশু জিয়ানা জানে না, কালো চামড়ায় জন্মালে বাবাকে হারাতে হয়
বাবার জীবন কেড়ে নিলো সাদার হাঁটু
মা মা চিৎকার, কার কানে যায়?
কালোর গোঙানি কতদূর যায় যখন শ্বাসনালি জব্দ!
কালোদের চোখের জল কি কালো?
কালোদের রক্তের রঙ কি কালো?
কালোদের মুখে কি কালো ভাষা?
কালোদের ভালোবাসা কি কালোয় ভরা?
কেউ বলে না উত্তর!
সবায় দর্শক বৈষম্যের আর্তনাদে
সবায় নির্বাক যখন গলায় আটকানো চাপ
ক্ষমতা মমতাহীন, মানুষে মানুষে ফারাক
ক্ষমতা বাদুড় বানায়, দিনে দেখে না, রাতে ফোটে চোখ|
আমারে বাঁচতে দাও, আমার জিয়ানার বয়স মাত্র ছয়
কন্যাকে যে হাতে আদর করেছি সকালে
তা পিছমোড়া করে বেঁধেছো কেন?
বাবা বাবা বলে যে ঘাড়ে লাফিয়ে উঠতো মেয়ে
তা হাঁটু দিয়ে চেপে ভেঙে দিচ্ছো কেন?
তবে মেয়েকে কোথায় রাখবো ঘুরে বেড়ানোর কালে?
আমারে বাঁচতে দাও, শ্বাস নিতে দাও
দয়া করো, ‘আই কান্ট ব্রিদ’
আই কান্ট...
আমি ধরতে চাই জিয়ানার হাত
আয় খুকী আয়...
কালোদের অপরাধ কালো রঙ
সাদাদের অহংকার জন্মের
কোথাও মানুষ নেই, কেউ সাদা কেউ কালো!
কোথাও মানুষ নেই, কেউ উঁচু কেউ নিচু!
কোথাও মানুষ নেই, কারো আছো কারো নেই!
ভাগাভাগি ˆবষম্য আকাশপাতাল |
অনেকে ভেবেছিলো ঘুচে যাবে ব্যবধান মহামারীকালে
নতুন পৃথিবী হবে সমব্যথী মনে
হয়তো হিসেবে ভুল; হয়তো পরিণতি মৃত্যু
এমনও হতে পারে মৃত্যুতেই মুছে যাবে মানুষের ভেদাভেদ!
পাতাজন্ম ও ঝরা পাতা
পাতা জন্মাতে দেখিনি; পাতা ঝরা দেখেছি
ঝরাপাতার রঙ কী? ক্ষয়ে যাওয়া অবশেষ
বনের গভীরে যারা যায় তারা চিনে
রঙ নেয়া ঝরাপাতা|
ঝরাপাতা উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে আসে
পড়ে থাকে মাটিলগ্ন, নিজের খেয়ালে
প্রজাপতি সঙ্গে উড়ে;
উড়ে উড়ে প্রজাপতি কই যায়?
প্রজাপতির ঘর কই?
পাতারা সংলগ্ন থাকে মায়ের বুকে
প্রজাপতি উড়ে এসে ঠোঁটে দেয় চুমু
ঝরাপাতা উড়ে হয় প্রজাপতি সখা...
কখনো পাতা হয় প্রজাপতি পাখা
কখনো পাখা হয় রঙ করা পাতা
মিলে যায় অবলীলায় অদৃশ্য লীলায়
শরীর নিখোঁজ হয় চেতনা গভীরে...
কারও জন্ম পথে-ঘাটে, কারও ঘর নেই
দেখা হয় অকারণে, কারণও খোঁজে
পাতা জন্মাতে দেখিনি;
চারা বের হলে পড়ে থাকে বীজের খোলস...
পাতা ঝরার দিন
পথও স্মৃতির মতো স্থির হয়ে থাকে প্রিয়জন হারালে
বসন্তে কোকিল ডাকে অথচ তখনও বৃক্ষের পাতা ঝরে
আমের মুকুল ঘ্রাণ সুরভিত কথা নিয়ে ফিরে
জীবন জলসায় করুণ সুরে বাজে অতীত সানাই!
পথ অবিকল, তবে প্রতিবেশী বৃক্ষরা কিছুটা প্রবীণ
নামফলক নেই, কারা থাকে এ ঘরে এখন?
আমরাও ছিলাম একদা এখানে, কথাটা বলবো;
যখনই হাজির হই ছবির কাছে কিংবা সাক্ষাতে!
কামিনী ফুলের গাছটা কই? চড়ুইপাখির কিচিরমিচির!
প্রকৌশলে অপসৃত বহু আগে, পাখি আর আসে না ভোরে
বিদ্যুৎ এর তারে কাক বসে, ডাকে, কুহু কদাচিৎ শুনি
পরিচিত চিহ্ন সামনে এলে স্মৃতি ফিরে অনুষঙ্গসহ...
ঝরাপাতার গায়ে পা পড়লেই বেজে ওঠে সমাপ্তির গান!
শীতের মায়া বেশি
জড়াজড়ি ওমে কেটে যায় রাত
শূন্য অনুভব যার সে জানে শীতের বিরহ!
সকালের লেপ্টে থাকা রোদ চেষ্টায় সরে না
শরীর, উঠোন, পথে লেগে থাকে আলিঙ্গন
বোঝাপড়া বাড়ে কুয়াশার ঘেরে নিঃসঙ্গ সড়কে
অস্পষ্টতাও অধিক শীতের সন্ধ্যায়
উষ্ণতার খোঁজে ভালোবাসা গতিশীল স্রোত;
যেভাবে জড়াতে চায়, অনেকটা কুয়াশার জট!
যেখানে মায়ার ডাক,
সেখানে অস্পষ্ট ছায়া থাকে নাকি?
কারও কারও শীতে ভয়;
দূরের যাত্রায় শংকা নিয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে থাকে
মুখে ধোঁয়া ওঠা তবুও থামে না!
শীতপর্ব শেষ কবে?
পরিমাপ করে প্রবাহিত মৌসুমি বায়ুর তেজ
যত শীত তত গান পর্যটক দলে
সুরে ভয় পায় শীত, সুরে রোদ, সুরে বেগ বাড়ে পায়ে
কর্মযাত্রায় আলস্য পেলে আবেগে জড়ায় শীত!
শীতের সকালে শুয়ে শুয়ে,
মন্ত্রোচ্চারণের মতো যদি মোটা ¯^রে বলা যায়;
তোমাকেই ভালোবাসি খুব,
তবে অনুভূত হয় মনোতলে গভীরতা...
জানা যতোটুকু অজানা অধিক
সবই সঠিক কিনা জানি না;
তবুও সময়ে বোঝা যায় মনোযোগ, অভিযোগ!
এক এক করে দূরে সরে যায় অনেকে...
নিজের জন্মবৃত্তান্তে লিখি মাতামুহুরীর নাম
বিনামারা গ্রাম রয়ে যায়, যায় না কোথাও
আমারে আঁকড়ে ধরে, আমিও জড়িয়ে
বাহিত রক্তকণিকা পরিচয় বলে...
একসময় যারা ছিল পাটাতন, দাঁড়াবো
ক্ষয়ে নুয়ে গেছে কিছুদিন পরে; চলমান স্রোত
আয়নায় মুখ আসে অপসৃত ছায়ায়
বেলা পড়ে এলে আলো কমে কমে
কালো কালো রেখা...
যতোদূর হাঁটা পথ ততোটুকু জানা, অজানাই বেশি
স্বরূপে চিহ্নিত হয় দূরে সরে গেলে
কতোটুকু কাছে গেলে আগুন অচেনা?
কতোটুকু দূরে গেলে আমিও অজানা!
জানি, নদীও মনে রাখে না দূরত্বের পথ
শুধু লুকিং-গ্লাস জানে কার হাসি কার ছায়া!
হারানো অনুভব
শুরুতেই কান্না, বিদায়েও কান্না
মাঝের শূন্যতা জুড়ে আনন্দ-বেদনা!
সুন্দরের আয়ু কম, যেমন গোলাপ ঝরে
সুখ ক্ষণিকের তারপর মরীচিকা খেলা!
প্রস্ফুটিত ফুলের সৌন্দর্যে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রজাপতিও জানে পাপড়ি ঝরে যাবে নিজস্ব নিয়মে
কান্নার প্রকাশ যেন বরফখণ্ডের পানিতে ভাসার মতো
অবস্থিতি তলে অধিক...
তোমাকে বোঝাতে পারিনি তাই অশ্রুই ভরসা
মুহূর্ত হারিয়ে গেলে ফেরানো মুশকিল!
পথ সরে গেলে দেখা নেই, হারানো অনুভব...
ফেনাদাগ
সমুদ্রের ফেনারেখা কুলের দিকে যায়;
সমস্ত অনুভব-উত্তেজনা কুণ্ডলী পাকিয়ে!
আমিও আশ্রয় নিই আকাঙ্ক্ষিত মনোচরে
জানি, কোনকিছুই বেশিক্ষণ থাকে না কাছে
যেমন তরঙ্গ সমুদ্রচরে
যেমন তীরকেও ছেড়ে দেয় ধনুক...
মুহূর্ত সমর্পণ করে পরবর্তী ধাপে
তবুও
প্রতিটি ঢেউ রেখে যায় কিছু ফেনাদাগ...
স্মারকচিহ্ন
কুহু ডাক শুনতে শুনতে আমিও একদিন
ফাগুনে পাতা ঝরার মতো ঝরে যাবো
একই পথে তুমি ও তোমরা হেঁটে যাবে
তারপরে তোমাদের বংশধর...
এক একটি চিহ্ন নিয়ে পথে পথে স্মারক!
আগমন হেতু জানি না, জানি চলমান ধারা
স্মৃতি, স্বর, অবয়ব ক্ষয়ে যায়, রয়ে যায় পথ
কথাসব মিশে যায় ধূলিময় ঘাসে|
ফসিল হয়ে যদি নামফলক উন্মোচিত হয়
তবে মনে পড়বে, মুখোমুখি খণ্ডিত অতীত!
ছায়া অবয়ব
ঘর হতে বের হলে ঘরে ফেরা যায় না আর!
পরিজন ঘরে ফিরে, জনাবৃত্তে কথা আর ছবি তার
কুশলে জানার ছিল বিবিধ বিষয়, বাকি থাকে!
শেষ কথা প্রতিধ্বনি দেয়ালে খেয়ালে অথচ নীরব
শ্বাস ছেড়ে গেলে ঘর লাগে কি আর? পুরোটাই ঘর
নিশ্বাস নিয়েছি বহু, চিৎকারেও থাকে না কেউ শেষে
শ্বাস ছেড়ে গেলে আশ বাড়ে নাকি? আশ্বাস অশেষ...!
জীবনের জয় নাকি পরাজয়, অহেতুক তর্ক চলে
সম্পর্কের আঁকা রেখা বাঁকা-সোজা, খোঁজে না কারণ
পাশাপাশি যাত্রাপথ ভিন্ন মত নিয়ে অভিমান অভিযোগ
একসময় থামে, নাই কোলাহল, কোনো কথা নেই,
অমাবস্যা নাকি?
ঘরের ঠিকানা ঠিক, মানচিত্রে বেদখল ঘর,
ফেরা হলো না আর!
বিনা নোটিশে যারা ছেড়ে যায় তাদের খোঁজ নিতে হয় পথে
সীমানা পর্যন্ত অভিকর্ষ টান তারপর পরিভ্রমণ শূন্যে...
হাতের ইশারা নেই চোখের নিশানা নেই কোথাও পরিধি নেই
লোকালয়ে জমা কথা ঘুমচোখে জেগে ওঠে,
জানায় একদা ছিলাম তোমাদের মাঝে...
কে যেন বললো পথে, আয়ুরেখা ধরে ঘরে যেতে হয়
কার ঘর? কোন ঘর? ঘর চেনা মুশকিল বিষম সময়ে
একদা আকুতি ছিল, মিনতি করেছি বহু, এখন নীরব
যার যার মতো ফিরে যায় ঘরে, পড়ে থাকে ছায়া অবয়ব
মধ্যবর্তী
দূরসমস্তকুয়াশায় ঘেরা তবুও অবয়বে বোঝা যায়
তবুও মনে হয় আছে
তবুও মনে হয় ছোঁয়া যাবে
ডাক দিলে সাড়া দিবে সহসাই!
মাঝখানে যেসব পরম্পরা ক্রমশ স্পষ্ট হয়
কখনও গাঢ়ত্ব বাড়ে,কখনও বদলায় রঙ,পা বাড়ানো রূপান্তর
সমবেত আয়োজন-গুঞ্জরণ কিংবা পরিপূর্ণতার মরীচিকা
যুগল প্রজাপতির দৌড়, আগে পিছে এলোমেলো খেলা
যত অবয়ব গড়া মনে স্বনির্মিত কারুকাজ
অনুভবে অনুবাদ যুক্তিতে সংশয়
দূর পথ ধরে হেঁটে গেলে দূরত্ব কমে কি?
ফিরে ফিরে খোঁজে হিসাবের কতকিছু আনন্দ-বেদনার|
গম্ভীর বেদনা
অস্থায়ী আনন্দ ঘিরে অচিন বাতাস
নীরবে আঁধার আসে,ফিরে যায় মুখ
দলাপাকানো বেদনা স্বয়ংক্রিয় পথে...
কুণ্ডলী পাকানো আলো,পরিধিতে ঘিরে থাকা কালো
নির্ঘুম রাতের কথা গম্ভীর গহীন
ভর বেড়ে গেলে জ্বর,তারপর পোড়ানো অগ্নি;
ছাই জমা থাকে তার|
শীতল বাতাসে কেন মন কাঁদে?
রোদে জায়মান বোধ
বৈশাখের অর্ধনগ্ন বনে
বিক্ষিপ্ত ভাবনা শুকাতে দিয়েছি রোদে
তীব্র তাপদাহে শীতল বাতাস চায় মন
প্রশান্তির খোঁজে পাশে জলাশয়,
চিকচিক করে জলের উপরিতল
এমন দুপুর নীরবে হাজির ঘাসের ওপর|
স্মৃতি এক প্রলম্বিত ছায়া
বেলা বুঝে বাড়ে-কমে, ফিরিয়ে দেয় পুরাঘটিত অতীত
দাগী কথা মনে পড়ে, বাকিসব উড়ে গেছে দশা-ঘষা কালে
রোদের হাহাকারে আমিও তৃষ্ণার্ত বেদুঈন
পুশকার মরু পার হই তুমি লক্ষবিন্দু
ফনিমনসার পাশেই রক্তাভ গোলাপ, ভ্রমণপথের চিহ্ন
পথই বহন করে যাবতীয়অনুভব...
তবুও পথ চিনে না পথিক;
শুধু পথিক মনে রাখতে চায় পথের বাঁক
ঝলসানো রোদে বেশিদূর দেখা যায় না
কপাল কুঁচকে চোখের পাতায় টেনে আনি পথ
এক একটা পথ এক একটা প্রতীক এক একটা গল্প
পথ হারালে মনে পড়ে চেনা পথের বয়ান...
রোদ উঁচু হতে হতে দেয়াল হয়,
বারান্দায় বিস্তারিত রোদের শরীর
আবদ্ধ হয়ে বসে থাকি রোদে পোড়া ঘরে...
রোদের প্রাবল্য থেমে গেলে পরিশ্রান্ত গোধূলির ছায়া!
ঘোরলাগা টান
বালিশের নিচে রাখা অগোছালো অনুভব
হলুদ খামের চিঠি,সযত্নে গোপন
দৈনিক হিসাব-নিকাশ, বিমর্ষ সময়ের ফাঁকে
উঁকি মারে তরঙ্গিত শব্দ, ভালোবাসি|
বিনিদ্র রাতের কথা, স্বগতোক্তি, জীবন্ত কল্পনা
স্পষ্ট হয় প্রহরে প্রহরে, ঘোরলাগা টান
কথোপকথনে রেশ থাকে শেষ হলেও
তৃষা জাগে শুধু দেখা হোক
দেখা হলে বলা হয় না আর বেশি!
ভালোবাসলে বুক মোচড়ানো ছাড়ে না অস্থির বাদক!
বালিশের কাছে সংরক্ষিত থাকে আনন্দ-বেদনা
গোপনীয় কক্ষে যত্নে জমা শব্দগুলো ঢেউ তোলে
চরে স্পষ্ট করে চিহ্ন, ভিন্ন ভিন্ন সময়ের অনুনাদ
একা হলে ভিড় করে মুখ, চোখ, কথা, হাসি, চিঠির আবেগ
ভাসমান
ভ্রমণের পথ ভাঙে নদীর ঢেউ
এগিয়ে যায় কুয়াশা ডিঙিয়ে
লক্ষবিন্দু দূরে অথচ নাগালে
বাতাসের বেগে ছুটে যায় মন...
যত কথা মনের সঙ্গে জলের সঙ্গে
বিস্তারিত আকাশের গায়ে সারাংশ লিখে
অসার ভেবেও ভাসি, ভালোবাসি আশপাশ
শ্বাস ঘন হলে রেশ কেটে যায়, আমিও ভাসমান কচুরিপানা
জড়িয়ে থাকার কালে মনে পড়ে জুড়ানো সময়
ডায়েরির পাতা জুড়ে চিহ্ন, প্রতিবিম্ব জেগে রয়
কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া নব্বইয়ের দশকের বিশিষ্ট কবি। তিনি ১৯৬৯ সালের ১৫ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানার বিনামারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’, ‘নদীর নিজস্ব ঘ্রাণ’, ‘লাভলেইন’, ‘জ্বর ও নজর’ প্রভৃতি। বসবাস: চট্টগ্রাম জেলায়।

আপনার মতামত লিখুন