হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন ভরা ধানের মৌসুম। অথচ কৃষকের মুখে নেই হাসি। গত চার দিনের টানা বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। বজ্রপাতের আতঙ্কে কৃষকেরা মাঠে নামতেও পারছেন না।
ফলে পাকা ধান কাটার উৎসব এসে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বোরো চাষিদের। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করা হাবিব মিয়ার মতো হাজারো কৃষকের এখন শুধু কান্নাই বাকি।
শুক্রবার (১ মে) বানিয়াচং উপজেলার রাজারপুর গ্রামের হাবিব মিয়া নিজের তলিয়ে যাওয়া জমির পাশে বসে কাঁদছিলেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি ৯ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। পরিবারের ৮ সদস্যের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা- সবকিছুই নির্ভর করেছিল এই এক ফসলের ওপর। কিন্তু এবার এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শনি হাওর, কালার হাওর, কাকাইলছেও হাওর; বানিয়াচং উপজেলার উত্তর হাওর, ডাকাতিয়া হাওর, বড় হাওর, রাউতপাড়া হাওর; লাখাই উপজেলার বুল্লার হাওর, স্বজন হাওর, ভবাণীপুর হাওর ও হবিগঞ্জ সদরের গুঙ্গিয়াজুরি হাওরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ধানের জমি পানিতে ডুবে আছে। তিন-চার দিন আগেও যেখানে পাকা ধান বাতাসে দুলছিল, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানির নিচে ডুবে থাকা সোনালি ফসল।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত চার-পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই ও হবিগঞ্জ সদরে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। শ্রমিক সংকট ও ধান কাটার যন্ত্রের অভাবে অনেক কৃষক ডুবে থাকা ধান কাটতেও পারছেন না।
শুক্রবার সকালে বানিয়াচং উপজেলার উত্তর হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা কোমরপানিতে নেমে ‘কোমরডোবা’ ধান কাটছেন। কেউ নৌকা দিয়ে ধান কেটে পাড়ে আনছেন। কেউ আবার অতিরিক্ত খরচে শ্রমিক এনে কোনো রকমে ফসল তুলছেন। অনেকে শেষ চেষ্টা হিসেবে পানিতে ডুব দিয়ে পচা ধান কেটে কলাগাছের ভেলায় তুলে আনছেন। তবু অনেক জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
হাবিব মিয়ার পাশে বসে আরেক কৃষক রতন মিয়াও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ভাই, সংবাদ কইরা কীতা অইবো, আমার সর্বনাশ অইয়া গেছেগা। সোনার ধানগুলা পাইক্কা জলমল করছিল, আর চার-পাঁচটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে আনতে পারলাম না। এহন পরিবার নিয়া কেমনে চলতাম।’
একই গ্রামের আরেক কৃষক আবদুল মালেক জানান, ৫ একর জমিতে তার ধান ছিল। প্রায় সব জমিই পানির নিচে। তিনি বলেন, ‘ধারদেনা কইরা চাষ করছি। এখন ধান নাই, টাকা নাই। ঋণ শোধ করমু কেমনে, বুঝতাছি না।’
বানিয়াচং উপজেলার সাঙ্গর গ্রামের কৃষক কাজল মিয়া বলেন, ‘কয়েকদিন আগে পর্যন্ত ধান কাটার মানুষ পাইতেছি না। এখন আবার পানি আইয়া সব শেষ কইরা দিলো। কিছু আধাপাকা ধান কাইট্টা আনছি, কিন্তু অর্ধেকই নষ্ট।’
কলার ভেলা বানিয়ে বোরো ধান উদ্ধারের চেষ্টা। ছবি: প্রতিনিধি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে হবিগঞ্জ জেলায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হাওরাঞ্চলে। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও আকস্মিক পানি বৃদ্ধির কারণে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান। তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে।

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬
হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন ভরা ধানের মৌসুম। অথচ কৃষকের মুখে নেই হাসি। গত চার দিনের টানা বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। বজ্রপাতের আতঙ্কে কৃষকেরা মাঠে নামতেও পারছেন না।
ফলে পাকা ধান কাটার উৎসব এসে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বোরো চাষিদের। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করা হাবিব মিয়ার মতো হাজারো কৃষকের এখন শুধু কান্নাই বাকি।
শুক্রবার (১ মে) বানিয়াচং উপজেলার রাজারপুর গ্রামের হাবিব মিয়া নিজের তলিয়ে যাওয়া জমির পাশে বসে কাঁদছিলেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি ৯ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। পরিবারের ৮ সদস্যের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা- সবকিছুই নির্ভর করেছিল এই এক ফসলের ওপর। কিন্তু এবার এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শনি হাওর, কালার হাওর, কাকাইলছেও হাওর; বানিয়াচং উপজেলার উত্তর হাওর, ডাকাতিয়া হাওর, বড় হাওর, রাউতপাড়া হাওর; লাখাই উপজেলার বুল্লার হাওর, স্বজন হাওর, ভবাণীপুর হাওর ও হবিগঞ্জ সদরের গুঙ্গিয়াজুরি হাওরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ধানের জমি পানিতে ডুবে আছে। তিন-চার দিন আগেও যেখানে পাকা ধান বাতাসে দুলছিল, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানির নিচে ডুবে থাকা সোনালি ফসল।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত চার-পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই ও হবিগঞ্জ সদরে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। শ্রমিক সংকট ও ধান কাটার যন্ত্রের অভাবে অনেক কৃষক ডুবে থাকা ধান কাটতেও পারছেন না।
শুক্রবার সকালে বানিয়াচং উপজেলার উত্তর হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা কোমরপানিতে নেমে ‘কোমরডোবা’ ধান কাটছেন। কেউ নৌকা দিয়ে ধান কেটে পাড়ে আনছেন। কেউ আবার অতিরিক্ত খরচে শ্রমিক এনে কোনো রকমে ফসল তুলছেন। অনেকে শেষ চেষ্টা হিসেবে পানিতে ডুব দিয়ে পচা ধান কেটে কলাগাছের ভেলায় তুলে আনছেন। তবু অনেক জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
হাবিব মিয়ার পাশে বসে আরেক কৃষক রতন মিয়াও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ভাই, সংবাদ কইরা কীতা অইবো, আমার সর্বনাশ অইয়া গেছেগা। সোনার ধানগুলা পাইক্কা জলমল করছিল, আর চার-পাঁচটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে আনতে পারলাম না। এহন পরিবার নিয়া কেমনে চলতাম।’
একই গ্রামের আরেক কৃষক আবদুল মালেক জানান, ৫ একর জমিতে তার ধান ছিল। প্রায় সব জমিই পানির নিচে। তিনি বলেন, ‘ধারদেনা কইরা চাষ করছি। এখন ধান নাই, টাকা নাই। ঋণ শোধ করমু কেমনে, বুঝতাছি না।’
বানিয়াচং উপজেলার সাঙ্গর গ্রামের কৃষক কাজল মিয়া বলেন, ‘কয়েকদিন আগে পর্যন্ত ধান কাটার মানুষ পাইতেছি না। এখন আবার পানি আইয়া সব শেষ কইরা দিলো। কিছু আধাপাকা ধান কাইট্টা আনছি, কিন্তু অর্ধেকই নষ্ট।’
কলার ভেলা বানিয়ে বোরো ধান উদ্ধারের চেষ্টা। ছবি: প্রতিনিধি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে হবিগঞ্জ জেলায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হাওরাঞ্চলে। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও আকস্মিক পানি বৃদ্ধির কারণে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান। তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে।

আপনার মতামত লিখুন