সংবাদ

পিএসসি সংশোধন: সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ‘এবার সাড়া মিলবে’


ফয়েজ আহমেদ তুষার
ফয়েজ আহমেদ তুষার
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম

পিএসসি সংশোধন: সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ‘এবার সাড়া মিলবে’

  • চার-পাঁচ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে: ইকবাল হাসান মাহমুদ

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা নিষ্পত্তি হয়েছে এক যুগের বেশী আগে। দুটো দেশই তাদের সমুদ্রাঞ্চল থেকে খনিজ সম্পদ আহরণ শুরু করেছে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিজস্ব সক্ষমতা না থাকায় বিদেশী অনুসন্ধান কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। তবে এখন পর্যন্ত কোন বিদেশী কোম্পানি অনুসন্ধান সমাপ্ত করেনি; বাংলাদেশের জন্য কোন সুখবরও আসেনি।

‘অনুসন্ধানের পর তেল-গ্যাস না পেলে বিরাট ক্ষতি; পাওয়া গেলেও খুব একটি লাভ আসবে না’-  এমন ধারণায় বিনিয়োগকারী বিদেশী তেল অনুসন্ধান কোম্পানিগুলো (আইওসি) এতদিন বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানে বাংলাদেশের প্রস্তাবে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। যেকটি কোম্পানি কাজ করতে এসেছে, এক পর্যায়ে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই তারা ব্লকগুলো ছেড়ে চলে গেছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশী তেল উত্তোলন কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আপত্তি বিবেচনা করে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন ব্যয় পুনরুদ্ধার এবং কাজের বাধ্যবাধকতার শর্তে সংশোধন এনে নতুন ‘মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং চুক্তি’ (পিএসসি) চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এখন, বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সংশোধিত আর্থিক ও চুক্তিগত শর্তে ২৬টি অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে শিগগিরই দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।

শিগগিরই আন্তর্জাতিক দরপত্র

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগামী ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সোমবার ঢাকার রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের কাউন্সিল হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, সরকার আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানির দিকে যেতে চায়।

পিএসসি প্রসঙ্গে এর আগে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদর বা ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং প্রতি পাঁচ বছর পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তা সমন্বয় করা হবে।

নীতিগত অনুমোদন

দেশের সমুদ্রাঞ্চলে জ্বালানি অনুসন্ধানের কাঠামোগত উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)। গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সিসিইএ’র এ বছরের ১৩তম সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের উপস্থাপিত এ প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো- সমুদ্রবক্ষে হাইড্রোকার্বন বা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার চুক্তিনামাকে আরো আধুনিক ও শক্তিশালী করা। সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং কারিগরি কার্যক্রম সহজতর করতে সংশোধিত খসড়া প্রস্তাবটি নীতিগত অনুমোদনের সুপারিশ করে কমিটি।

পিএসসির নতুন শর্ত

পিএসসিতে যুক্ত নতুন শর্তানুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া ব্লকের ২০ শতাংশ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাইপলাইন ট্যারিফ টেন্ডার জয়ী কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে, তবে অবকাঠামো ব্যয় পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের সুযোগ বহাল থাকছে।

গ্যাসের মূল্য নির্ধারণেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের পাঁচ বছরের গড় দামের ১১ শতাংশ হারে নির্ধারিত হবে, যেখানে তেলের দামের ন্যূনতম ৭০ এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার সীমা থাকবে। অগভীর সমুদ্রে এ হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বার বার ব্যর্থ

বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক। ২০১০ সালে ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে চারটি বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই তারা ব্লকগুলো ছেড়ে দেয়। ২০১৬ সালে শেষবার দরপত্র ডাকা হলেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখায়নি। এরপর ২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হলেও দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। পরে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের মডেল পিএসসি তৈরি করা হয়।

নতুন মডেল পিএসসি অনুযায়ী, অগভীর সমুদ্রে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার এবং গভীর সমুদ্রের জন্য ৭ দশমিক ২৬ মার্কিন ডলার। সম্পদ উত্তোলনে বাংলাদেশের অংশের হিস্যা বা মালিকানার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়। অগভীর সমুদ্রে নতুন মডেলে বাংলাদেশের হিস্যা করা হয় ৪০-৬৫ শতাংশ, যা আগে ছিল ৫০-৮০ শতাংশ। গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের হিস্যা ৩৫-৬০ শতাংশ করা হয়, যা আগে ছিল ৫০-৭৫ শতাংশ। প্রয়োজনীয় শর্তসাপেক্ষে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়।

সর্বশেষ মডেল পিএসসি-২০২৩ এর আলোকে ২০২৪ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মার্কিন কোম্পানি এক্সোন মবিলসহ ৭টি আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা কোম্পানি দরপত্র কিনেছিল। এরমধ্যে ২টি কোম্পানি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ডেটাও কিনেছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে তারা শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়নি।

সরকারের সংশ্লিষ্টদের মতে, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলো অনাগ্রহী ছিল। তবে সংশোধিত নতুন পিএসসির আলোকে এবার দরপত্র আহ্বান করা হলে বিদেশী কোম্পানিগুলোর ‘সাড়া পাওয়া যাবে’।

স্থলভাগেও ২১ ব্লক

অফশোরের পাশাপাশি স্থলভাগে ২১টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। তবে পার্বত্য এলাকার ২২এ ও ২২বি ব্লক এর বাইরে থাকবে। বর্তমানে আইওসি শেভরন প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ৩৩৯ টাকা এবং টাল্লো ২৮৪ টাকায় বিক্রি করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক অনেক কম।

এলএনজি নির্ভরতা

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি থেকে আসে ৮৫-১০০ কোটি ঘনফুট। ২০৩০ সালে দৈনিক চাহিদা বেড়ে ৬৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমামের মতে, বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের পূর্বাংশে এলাকাবিশেষে অনুসন্ধান জোরালো দেখা গেলেও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর অংশে গ্যাসের অনুসন্ধান হয়েছে সামান্য। দেশের সম্ভাবনাময় সমুদ্রবক্ষও জোরালো গ্যাস অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি।

তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার ও ভারত একই সাগরে তাদের অংশে জোরালো অনুসন্ধান করে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, দ্রুত বঙ্গোপসাগরে অগভীর ও গভীর সব জায়গায় অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। পাশপাশি স্থলেও গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুত ২৯ দশ‌মিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট অবশিষ্ট রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬


পিএসসি সংশোধন: সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ‘এবার সাড়া মিলবে’

প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬

featured Image

  • চার-পাঁচ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে: ইকবাল হাসান মাহমুদ

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা নিষ্পত্তি হয়েছে এক যুগের বেশী আগে। দুটো দেশই তাদের সমুদ্রাঞ্চল থেকে খনিজ সম্পদ আহরণ শুরু করেছে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিজস্ব সক্ষমতা না থাকায় বিদেশী অনুসন্ধান কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। তবে এখন পর্যন্ত কোন বিদেশী কোম্পানি অনুসন্ধান সমাপ্ত করেনি; বাংলাদেশের জন্য কোন সুখবরও আসেনি।

‘অনুসন্ধানের পর তেল-গ্যাস না পেলে বিরাট ক্ষতি; পাওয়া গেলেও খুব একটি লাভ আসবে না’-  এমন ধারণায় বিনিয়োগকারী বিদেশী তেল অনুসন্ধান কোম্পানিগুলো (আইওসি) এতদিন বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানে বাংলাদেশের প্রস্তাবে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। যেকটি কোম্পানি কাজ করতে এসেছে, এক পর্যায়ে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই তারা ব্লকগুলো ছেড়ে চলে গেছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশী তেল উত্তোলন কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আপত্তি বিবেচনা করে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন ব্যয় পুনরুদ্ধার এবং কাজের বাধ্যবাধকতার শর্তে সংশোধন এনে নতুন ‘মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং চুক্তি’ (পিএসসি) চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এখন, বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সংশোধিত আর্থিক ও চুক্তিগত শর্তে ২৬টি অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে শিগগিরই দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।

শিগগিরই আন্তর্জাতিক দরপত্র

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগামী ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সোমবার ঢাকার রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের কাউন্সিল হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, সরকার আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানির দিকে যেতে চায়।

পিএসসি প্রসঙ্গে এর আগে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদর বা ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং প্রতি পাঁচ বছর পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তা সমন্বয় করা হবে।

নীতিগত অনুমোদন

দেশের সমুদ্রাঞ্চলে জ্বালানি অনুসন্ধানের কাঠামোগত উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)। গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সিসিইএ’র এ বছরের ১৩তম সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের উপস্থাপিত এ প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো- সমুদ্রবক্ষে হাইড্রোকার্বন বা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার চুক্তিনামাকে আরো আধুনিক ও শক্তিশালী করা। সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং কারিগরি কার্যক্রম সহজতর করতে সংশোধিত খসড়া প্রস্তাবটি নীতিগত অনুমোদনের সুপারিশ করে কমিটি।

পিএসসির নতুন শর্ত

পিএসসিতে যুক্ত নতুন শর্তানুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া ব্লকের ২০ শতাংশ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাইপলাইন ট্যারিফ টেন্ডার জয়ী কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে, তবে অবকাঠামো ব্যয় পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের সুযোগ বহাল থাকছে।

গ্যাসের মূল্য নির্ধারণেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের পাঁচ বছরের গড় দামের ১১ শতাংশ হারে নির্ধারিত হবে, যেখানে তেলের দামের ন্যূনতম ৭০ এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার সীমা থাকবে। অগভীর সমুদ্রে এ হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বার বার ব্যর্থ

বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক। ২০১০ সালে ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে চারটি বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই তারা ব্লকগুলো ছেড়ে দেয়। ২০১৬ সালে শেষবার দরপত্র ডাকা হলেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখায়নি। এরপর ২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হলেও দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। পরে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের মডেল পিএসসি তৈরি করা হয়।

নতুন মডেল পিএসসি অনুযায়ী, অগভীর সমুদ্রে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার এবং গভীর সমুদ্রের জন্য ৭ দশমিক ২৬ মার্কিন ডলার। সম্পদ উত্তোলনে বাংলাদেশের অংশের হিস্যা বা মালিকানার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়। অগভীর সমুদ্রে নতুন মডেলে বাংলাদেশের হিস্যা করা হয় ৪০-৬৫ শতাংশ, যা আগে ছিল ৫০-৮০ শতাংশ। গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের হিস্যা ৩৫-৬০ শতাংশ করা হয়, যা আগে ছিল ৫০-৭৫ শতাংশ। প্রয়োজনীয় শর্তসাপেক্ষে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়।

সর্বশেষ মডেল পিএসসি-২০২৩ এর আলোকে ২০২৪ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মার্কিন কোম্পানি এক্সোন মবিলসহ ৭টি আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা কোম্পানি দরপত্র কিনেছিল। এরমধ্যে ২টি কোম্পানি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ডেটাও কিনেছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে তারা শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়নি।

সরকারের সংশ্লিষ্টদের মতে, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলো অনাগ্রহী ছিল। তবে সংশোধিত নতুন পিএসসির আলোকে এবার দরপত্র আহ্বান করা হলে বিদেশী কোম্পানিগুলোর ‘সাড়া পাওয়া যাবে’।

স্থলভাগেও ২১ ব্লক

অফশোরের পাশাপাশি স্থলভাগে ২১টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। তবে পার্বত্য এলাকার ২২এ ও ২২বি ব্লক এর বাইরে থাকবে। বর্তমানে আইওসি শেভরন প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ৩৩৯ টাকা এবং টাল্লো ২৮৪ টাকায় বিক্রি করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক অনেক কম।

এলএনজি নির্ভরতা

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি থেকে আসে ৮৫-১০০ কোটি ঘনফুট। ২০৩০ সালে দৈনিক চাহিদা বেড়ে ৬৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমামের মতে, বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের পূর্বাংশে এলাকাবিশেষে অনুসন্ধান জোরালো দেখা গেলেও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর অংশে গ্যাসের অনুসন্ধান হয়েছে সামান্য। দেশের সম্ভাবনাময় সমুদ্রবক্ষও জোরালো গ্যাস অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি।

তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার ও ভারত একই সাগরে তাদের অংশে জোরালো অনুসন্ধান করে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, দ্রুত বঙ্গোপসাগরে অগভীর ও গভীর সব জায়গায় অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। পাশপাশি স্থলেও গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুত ২৯ দশ‌মিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট অবশিষ্ট রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত