ভঙ্গুর অর্থনীতির হাল ধরেই রেকর্ড আকারের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামীকাল ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট সংসদে উপস্থাপন করবেন। কিন্তু এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের পথে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগে সংকটসহ আটটি বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: দেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদা কমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, নতুন বিনিয়োগ কম, চলছে ব্যয় সাশ্রয় ও কর্মী ছাঁটাই। এই বাস্তবতায় বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রাজস্ব সংগ্রহ: বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয় কিনা, তা নির্ভর করছে করজাল সম্প্রসারণ ও রাজস্ব আহরণে গতি আনার ওপর। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো ও অটোমেশন জোরদার না করলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
কৃচ্ছ্রসাধন: সংকটকালীন সময়ে নেওয়া কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতি দীর্ঘমেয়াদে চললে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। তাই এই নীতি থেকে ধীরে ধীরে ও সুপরিকল্পিতভাবে বেরিয়ে আসা জরুরি। তবে কখন, কীভাবে এই উত্তরণ ঘটবে- সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ভর্তুকি: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতের বিপুল ভর্তুকির চাহিদা সরকারের জন্য গলার কাঁটার মতো। এই ভর্তুকির চাপ সামলে কীভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অর্থ সঞ্চালন সচল রাখা যায়, তা বড় চিন্তার বিষয়।
প্রকল্প: মেগা প্রজেক্টসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এনে অপচয় রোধ করা এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান দুই স্তম্ভ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের ধীরগতি রয়েছে। বিশেষ করে এই দুই খাতে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিনিয়োগ: দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের খরা কাটাতে আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ঋণ: বিগত সরকারের নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ পাহাড়সম। দেশের ঋণ ধারণ সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং ঋণের স্থিতিশীলতা রক্ষায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অর্থনীতিবিদরা বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি ও অটোমেশন জোরদার করতে হবে। আয়কর ও মূল্যসংযোজন করের আওতা বাড়াতে হবে এবং কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে হবে। এডিপির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবহার বাড়াতে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। সীমিত পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের আওতা আরও বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব চ্যালেঞ্জকে পাশ কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফেরানো মোটেও সহজ কাজ নয়। তবে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ও বাস্তবায়নে গতি আনলে কঠিন এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব।

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
ভঙ্গুর অর্থনীতির হাল ধরেই রেকর্ড আকারের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামীকাল ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট সংসদে উপস্থাপন করবেন। কিন্তু এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের পথে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগে সংকটসহ আটটি বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: দেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদা কমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, নতুন বিনিয়োগ কম, চলছে ব্যয় সাশ্রয় ও কর্মী ছাঁটাই। এই বাস্তবতায় বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রাজস্ব সংগ্রহ: বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয় কিনা, তা নির্ভর করছে করজাল সম্প্রসারণ ও রাজস্ব আহরণে গতি আনার ওপর। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো ও অটোমেশন জোরদার না করলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
কৃচ্ছ্রসাধন: সংকটকালীন সময়ে নেওয়া কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতি দীর্ঘমেয়াদে চললে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। তাই এই নীতি থেকে ধীরে ধীরে ও সুপরিকল্পিতভাবে বেরিয়ে আসা জরুরি। তবে কখন, কীভাবে এই উত্তরণ ঘটবে- সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ভর্তুকি: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতের বিপুল ভর্তুকির চাহিদা সরকারের জন্য গলার কাঁটার মতো। এই ভর্তুকির চাপ সামলে কীভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অর্থ সঞ্চালন সচল রাখা যায়, তা বড় চিন্তার বিষয়।
প্রকল্প: মেগা প্রজেক্টসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এনে অপচয় রোধ করা এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান দুই স্তম্ভ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের ধীরগতি রয়েছে। বিশেষ করে এই দুই খাতে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিনিয়োগ: দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের খরা কাটাতে আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ঋণ: বিগত সরকারের নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ পাহাড়সম। দেশের ঋণ ধারণ সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং ঋণের স্থিতিশীলতা রক্ষায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অর্থনীতিবিদরা বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি ও অটোমেশন জোরদার করতে হবে। আয়কর ও মূল্যসংযোজন করের আওতা বাড়াতে হবে এবং কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে হবে। এডিপির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবহার বাড়াতে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। সীমিত পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের আওতা আরও বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব চ্যালেঞ্জকে পাশ কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফেরানো মোটেও সহজ কাজ নয়। তবে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ও বাস্তবায়নে গতি আনলে কঠিন এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন