সংবাদ

যে অপমান জন্ম দিল ভারতের ‘ককরোচ বিপ্লব’


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

যে অপমান জন্ম দিল ভারতের ‘ককরোচ বিপ্লব’
ছবি : সংগৃহীত

ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক প্রতীক এখন তুমুল আলোচনায়- ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’। আদালতের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই রূপ নিয়েছে বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের এক নতুন আন্দোলনে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এই উদ্যোগ এখন ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যতম আলোচিত বিষয়। সাধারণভাবে যে প্রাণীকে নোংরা পরিবেশের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, সেটিকেই হাজার হাজার ভারতীয় তরুণ আজ প্রতিবাদের প্রতীক বানিয়েছেন।

২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে সরকারি চাকরির নিয়োগ, বেকারত্ব ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, চাকরিপ্রার্থী ও বেকার তরুণদের বোঝাতে ‘ককরোচ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অভিযোগ ওঠে যে তিনি কিছু বেকার যুবককে “ককরোচ” (তেলাপোকা) বলে উল্লেখ করেছিলেন।

মুহূর্তের মধ্যেই সেই খবর তরুণদের মনে তৈরি করে তীব্র ক্ষোভ। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দিপে সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। তার বার্তা ছিল স্পষ্ট- “ক্ষমতাসীনরা যদি আমাদের ‘ককরোচ’ ভাবে, তবে এই ককরোচ পরিচয় নিয়েই আমরা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াব।”

‘আমিও তেলাপোকা’ হ্যাশট্যাগ দেখতে দেখতে ইন্টারনেটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হলেও, দিনের পর দিন জমে থাকা তরুণদের ক্ষোভ এটিকে রাজপথে নিয়ে আসে। অপমানের ‘ককরোচ’ শব্দটি রাতারাতি বদলে হয়ে ওঠে প্রতিবাদের আত্মপরিচয়।

চাকরি প্রত্যাশীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার চরম সংকট এই প্রতীকের নিচে এসে একত্র হয়। দিল্লি থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের হাতে শোভা পেতে থাকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-এর পোস্টার ও ব্যানার।

‘ককরোচ’ আন্দোলন আপাতদৃষ্টিতে বেকারত্ব, পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সোচ্চার প্রতিবাদ। কিন্তু আন্দোলনের গতিধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর গভীরে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করছে আরও এক বড় সাংবিধানিক বিতর্ক- ভারতের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সার্বিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

যখন একজন হিন্দু, মুসলিম, শিখ বা খ্রিস্টান তরুণ বেকারত্বের একই যন্ত্রণায় রাস্তায় একসঙ্গে দাঁড়ায়, তখন সংবিধানে বর্ণিত ‘সর্বধর্ম সমভাব’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার মূল চেতনাটিই বাস্তব রূপ পায়। দেশের ২০ কোটিরও বেশি তরুণের একটি বড় অংশ যদি মনে করে তারা বৈষম্যের শিকার, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

সাধারণ তরুণদের এই অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহকে ঘিরে এখন সরগরম ভারতের রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে ‘ককরোচ’ আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন। রাহুল গান্ধীসহ একাধিক বিরোধী নেতা বেকারত্ব ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ইস্যুতে এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন।

আন্দোলনের রূপকার অভিজিৎ দিপের মূল ধারণাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন ধ্রুব রাঠীর মতো জনপ্রিয় ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ভিডিও, শর্টস এবং মিমের মাধ্যমে কোটি কোটি তরুণের কাছে পৌঁছে গেছে আন্দোলনের বার্তা।

আন্দোলনের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ হ্যাশট্যাগ। পাকিস্তানের তরুণরাও তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের সাথে মিল খুঁজে পেয়ে এই আন্দোলনে সংহতি জানাচ্ছেন, যা এটিকে একটি আঞ্চলিক তরুণ প্ল্যাটফর্মে রূপ দিচ্ছে।

ওয়েবসাইট ব্লক করা কিংবা পুলিশি বাধার পরও দমে যায়নি এই ‘ককরোচ’ জোট। রাজনৈতিক নেতা থেকে সাধারণ জনগণ- সবাই এখন অনুধাবন করছেন যে, রাষ্ট্র যাঁদের ‘ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয়’ ভেবে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, তারাই আজ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬


যে অপমান জন্ম দিল ভারতের ‘ককরোচ বিপ্লব’

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক প্রতীক এখন তুমুল আলোচনায়- ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’। আদালতের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই রূপ নিয়েছে বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের এক নতুন আন্দোলনে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এই উদ্যোগ এখন ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যতম আলোচিত বিষয়। সাধারণভাবে যে প্রাণীকে নোংরা পরিবেশের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, সেটিকেই হাজার হাজার ভারতীয় তরুণ আজ প্রতিবাদের প্রতীক বানিয়েছেন।

২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে সরকারি চাকরির নিয়োগ, বেকারত্ব ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, চাকরিপ্রার্থী ও বেকার তরুণদের বোঝাতে ‘ককরোচ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অভিযোগ ওঠে যে তিনি কিছু বেকার যুবককে “ককরোচ” (তেলাপোকা) বলে উল্লেখ করেছিলেন।

মুহূর্তের মধ্যেই সেই খবর তরুণদের মনে তৈরি করে তীব্র ক্ষোভ। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দিপে সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। তার বার্তা ছিল স্পষ্ট- “ক্ষমতাসীনরা যদি আমাদের ‘ককরোচ’ ভাবে, তবে এই ককরোচ পরিচয় নিয়েই আমরা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াব।”

‘আমিও তেলাপোকা’ হ্যাশট্যাগ দেখতে দেখতে ইন্টারনেটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হলেও, দিনের পর দিন জমে থাকা তরুণদের ক্ষোভ এটিকে রাজপথে নিয়ে আসে। অপমানের ‘ককরোচ’ শব্দটি রাতারাতি বদলে হয়ে ওঠে প্রতিবাদের আত্মপরিচয়।

চাকরি প্রত্যাশীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার চরম সংকট এই প্রতীকের নিচে এসে একত্র হয়। দিল্লি থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের হাতে শোভা পেতে থাকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-এর পোস্টার ও ব্যানার।

‘ককরোচ’ আন্দোলন আপাতদৃষ্টিতে বেকারত্ব, পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সোচ্চার প্রতিবাদ। কিন্তু আন্দোলনের গতিধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর গভীরে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করছে আরও এক বড় সাংবিধানিক বিতর্ক- ভারতের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সার্বিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

যখন একজন হিন্দু, মুসলিম, শিখ বা খ্রিস্টান তরুণ বেকারত্বের একই যন্ত্রণায় রাস্তায় একসঙ্গে দাঁড়ায়, তখন সংবিধানে বর্ণিত ‘সর্বধর্ম সমভাব’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার মূল চেতনাটিই বাস্তব রূপ পায়। দেশের ২০ কোটিরও বেশি তরুণের একটি বড় অংশ যদি মনে করে তারা বৈষম্যের শিকার, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

সাধারণ তরুণদের এই অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহকে ঘিরে এখন সরগরম ভারতের রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে ‘ককরোচ’ আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন। রাহুল গান্ধীসহ একাধিক বিরোধী নেতা বেকারত্ব ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ইস্যুতে এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন।

আন্দোলনের রূপকার অভিজিৎ দিপের মূল ধারণাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন ধ্রুব রাঠীর মতো জনপ্রিয় ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ভিডিও, শর্টস এবং মিমের মাধ্যমে কোটি কোটি তরুণের কাছে পৌঁছে গেছে আন্দোলনের বার্তা।

আন্দোলনের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ হ্যাশট্যাগ। পাকিস্তানের তরুণরাও তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের সাথে মিল খুঁজে পেয়ে এই আন্দোলনে সংহতি জানাচ্ছেন, যা এটিকে একটি আঞ্চলিক তরুণ প্ল্যাটফর্মে রূপ দিচ্ছে।

ওয়েবসাইট ব্লক করা কিংবা পুলিশি বাধার পরও দমে যায়নি এই ‘ককরোচ’ জোট। রাজনৈতিক নেতা থেকে সাধারণ জনগণ- সবাই এখন অনুধাবন করছেন যে, রাষ্ট্র যাঁদের ‘ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয়’ ভেবে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, তারাই আজ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত