‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে, অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে...’- নব্বই দশকের জনপ্রিয় রোমান্টিক গানের প্রথম লাইন। সেই প্রজন্মের এমন কেউ নেই যার এই সুর চেনা নয়। তবে গানটির জন্ম কীভাবে হয়েছিল তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই।
দেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় এই গানটি নিয়ে নতুন করে কৌতুহল বেড়েছে একটি ভাইরাল ভিডিও ঘিরে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল ‘শ্রাবণের মেঘগুলো...’ গানের সঙ্গে একটি রিল ভিডিও ফেসবুকে ছাড়িয়ে দেন। তা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন আরেকজন। যার প্রতিবাদে সারা দেশে একই গানের সঙ্গে হাজার হাজার ভিডিও ছড়াতে থাকে।
ফলে নব্বই দশকের তরুণদের মনে মুগ্ধতার বৃষ্টি ঝরানো সেই গান আবার নতুন করে সামনে এসেছে। সহজ-প্রাঞ্জল কথার এই গানটির সঙ্গে শ্রোতারা খুব সহজেই একাত্ম হয়ে যান। ছুটির দিনে, বৃষ্টি-ভেজা বিকেলে, ঘরোয়া আসরে- এখনও এই গানের পরিবেশনা থাকেই।
গানটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই ডিফরেন্ট টাচ ব্যান্ডের সিগনেচার গানে পরিণত হয়। উঠতি ব্যান্ডগুলো, যারা অন্য ব্যান্ডের গান কভার করে থাকে, তাদের পছন্দের শীর্ষে এখনো রয়েছে এই গানটি। আর তার জন্য শ্রোতাদের গ্রহণযোগ্যতাই মূল কারণ।
জানেন কি, এই গানের জন্ম কোনো এক শ্রাবণের রাতেই। শ্রাবণের বৃষ্টি আর এক অনিদ্রা রাত সাক্ষী হয়ে আছে গানটির জন্মের সঙ্গে। সেটা ১৯৮৭ সালের কথা। তখন ছিল শ্রাবণ মাস। সেবার দিনের পর দিন বৃষ্টি হচ্ছে। একনাগাড়ে চার দিন বৃষ্টি। অবস্থা এমন যে মানুষের বাড়ি থেকে বের হওয়া কঠিন।
ডিফরেন্ট টাচের নতুন অ্যালবামের মোটামুটি সব গান হয়ে গেছে। তখন ১২ গানে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামের প্রচলন ছিল। কিন্তু একটি গান দরকার। আর সেই দায়িত্ব পড়ল গীতিকার-সুরকার আশরাফ বাবুর ওপর।
কিন্তু কোনোভাবেই মাথায় আসছিল না কিছু। ওদিকে বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম। শেষ রাতের দিকে জানালার পাশে বসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা দেখতে দেখতে আশরাফ বাবুর মাথায় এল, এই শ্রাবণের বৃষ্টি নিয়ে একটা গান লিখলে কেমন হয়। এমনিতে কথাগুলো কিছুদিন ধরে রাস্তায় চলতে-ফিরতে মাথায় ঘুরছিল। আশরাফ বাবু লেখা শুরু করলেন-
‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে, অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে...’। এক লাইন-দুই লাইন করে লেখা হয়ে গেল ১২ লাইনের নতুন গান। আশরাফ বাবু বলেছিলেন, ‘ভোররাতের দিকে যখন পুরো গানটা শেষ করে উঠলাম, তখন স্বস্তি পেলাম, যাক শেষ পর্যন্ত কিছু একটা হলো।’
আশরাফ বাবু স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘অ্যালবামের শেষ গান ছিল এটি। পরদিন রেকর্ডিংয়ের উদ্দেশে ঢাকায় যাত্রা করবে ডিফরেন্ট টাচের সদস্যরা। আগের রাতে গানটির জন্ম। পরে সেই গান নিয়ে ঢাকায় গিয়ে অ্যালবামের জন্ম।
সব শেষ করে ঢাকা থেকে খুলনা ফিরে যান ডিফারেন্ট টাচের সদস্যরা। একদিন হঠাৎ করে খুলনা নিউমার্কেটের এক ক্যাসেটের দোকানে গানটি শোনেন আশরাফ বাবু। ডিফরেন্ট টাচের অ্যালবামটি প্রকাশ করেছিল ইলেকট্রা ভয়েস। গানটি প্রথম গেয়েছিলেন আলী আহমেদ বাবু।
ডিফরেন্ট টাচের শিল্পী মেজবাহ রহমান এক সাক্ষাৎকারে শুনিয়েছিলেন এক চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা। ১৯৯১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে এক কনসার্টে অংশ নেয় ডিফরেন্ট টাচ। বৃষ্টিকে উপজীব্য করে লেখা ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি শুরুর কয়েক মুহূর্ত পরই সত্যি সত্যি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। খোলা জায়গা হওয়ার কারণে সেদিনের মতো কনসার্ট বন্ধ হয়ে গেল।
মজার ব্যাপার হলো, পরের বছর একই জায়গায় আরেকটি কনসার্টে যখনই ডিফরেন্ট টাচ ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গাওয়া শুরু করল, তখন আবার বৃষ্টি শুরু হলো। যেন গানের সঙ্গে প্রকৃতির এক অলৌকিক যোগসূত্র!
গানের কথা যা আমাদের ভিজিয়ে দেয়। সেই কথা আর সুর ছিল আশরাফ বাবুর। পুরো গানটি হচ্ছে-
শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে
অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে
কবিতার বই সবে খুলেছি
হিমেল হাওয়ায় মন ভিজেছে
জানালার পাশে চাপা মাধবী
বাগানবিলাসী হেনা দুলেছে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে
মেঘেদের যুদ্ধ শুনেছি
সিক্ত আকাশ কেঁদে চলেছে
জমেছে হাঁসের জলকেলি
পথিকের পায়ে হাঁটা থেমেছে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে
নব্বই দশকের রোমান্টিক গানগুলোর অন্যতম এই গানটি আজও সমান জনপ্রিয়। বৃষ্টি এলেই শ্রোতাদের প্রথম পছন্দগুলোর একটি এটি। ডিফরেন্ট টাচের প্রধান ভোকাল মেজবাহ রহমানের কণ্ঠে গানটি যেমন শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়েছে, তেমনি এর সহজ-সরল কথাগুলোও যেন প্রতিটি বর্ষার দিনে নতুন অর্থ পায়।
প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও গানটির আবেদন ম্লান হয়নি। এটি এখনও প্রেম, মন খারাপ আর বৃষ্টির এক অনন্য মেলবন্ধন- যা বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে চিরন্তন হয়ে থাকবে।

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুলাই ২০২৬
‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে, অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে...’- নব্বই দশকের জনপ্রিয় রোমান্টিক গানের প্রথম লাইন। সেই প্রজন্মের এমন কেউ নেই যার এই সুর চেনা নয়। তবে গানটির জন্ম কীভাবে হয়েছিল তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই।
দেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় এই গানটি নিয়ে নতুন করে কৌতুহল বেড়েছে একটি ভাইরাল ভিডিও ঘিরে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল ‘শ্রাবণের মেঘগুলো...’ গানের সঙ্গে একটি রিল ভিডিও ফেসবুকে ছাড়িয়ে দেন। তা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন আরেকজন। যার প্রতিবাদে সারা দেশে একই গানের সঙ্গে হাজার হাজার ভিডিও ছড়াতে থাকে।
ফলে নব্বই দশকের তরুণদের মনে মুগ্ধতার বৃষ্টি ঝরানো সেই গান আবার নতুন করে সামনে এসেছে। সহজ-প্রাঞ্জল কথার এই গানটির সঙ্গে শ্রোতারা খুব সহজেই একাত্ম হয়ে যান। ছুটির দিনে, বৃষ্টি-ভেজা বিকেলে, ঘরোয়া আসরে- এখনও এই গানের পরিবেশনা থাকেই।
গানটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই ডিফরেন্ট টাচ ব্যান্ডের সিগনেচার গানে পরিণত হয়। উঠতি ব্যান্ডগুলো, যারা অন্য ব্যান্ডের গান কভার করে থাকে, তাদের পছন্দের শীর্ষে এখনো রয়েছে এই গানটি। আর তার জন্য শ্রোতাদের গ্রহণযোগ্যতাই মূল কারণ।
জানেন কি, এই গানের জন্ম কোনো এক শ্রাবণের রাতেই। শ্রাবণের বৃষ্টি আর এক অনিদ্রা রাত সাক্ষী হয়ে আছে গানটির জন্মের সঙ্গে। সেটা ১৯৮৭ সালের কথা। তখন ছিল শ্রাবণ মাস। সেবার দিনের পর দিন বৃষ্টি হচ্ছে। একনাগাড়ে চার দিন বৃষ্টি। অবস্থা এমন যে মানুষের বাড়ি থেকে বের হওয়া কঠিন।
ডিফরেন্ট টাচের নতুন অ্যালবামের মোটামুটি সব গান হয়ে গেছে। তখন ১২ গানে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামের প্রচলন ছিল। কিন্তু একটি গান দরকার। আর সেই দায়িত্ব পড়ল গীতিকার-সুরকার আশরাফ বাবুর ওপর।
কিন্তু কোনোভাবেই মাথায় আসছিল না কিছু। ওদিকে বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম। শেষ রাতের দিকে জানালার পাশে বসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা দেখতে দেখতে আশরাফ বাবুর মাথায় এল, এই শ্রাবণের বৃষ্টি নিয়ে একটা গান লিখলে কেমন হয়। এমনিতে কথাগুলো কিছুদিন ধরে রাস্তায় চলতে-ফিরতে মাথায় ঘুরছিল। আশরাফ বাবু লেখা শুরু করলেন-
‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে, অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে...’। এক লাইন-দুই লাইন করে লেখা হয়ে গেল ১২ লাইনের নতুন গান। আশরাফ বাবু বলেছিলেন, ‘ভোররাতের দিকে যখন পুরো গানটা শেষ করে উঠলাম, তখন স্বস্তি পেলাম, যাক শেষ পর্যন্ত কিছু একটা হলো।’
আশরাফ বাবু স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘অ্যালবামের শেষ গান ছিল এটি। পরদিন রেকর্ডিংয়ের উদ্দেশে ঢাকায় যাত্রা করবে ডিফরেন্ট টাচের সদস্যরা। আগের রাতে গানটির জন্ম। পরে সেই গান নিয়ে ঢাকায় গিয়ে অ্যালবামের জন্ম।
সব শেষ করে ঢাকা থেকে খুলনা ফিরে যান ডিফারেন্ট টাচের সদস্যরা। একদিন হঠাৎ করে খুলনা নিউমার্কেটের এক ক্যাসেটের দোকানে গানটি শোনেন আশরাফ বাবু। ডিফরেন্ট টাচের অ্যালবামটি প্রকাশ করেছিল ইলেকট্রা ভয়েস। গানটি প্রথম গেয়েছিলেন আলী আহমেদ বাবু।
ডিফরেন্ট টাচের শিল্পী মেজবাহ রহমান এক সাক্ষাৎকারে শুনিয়েছিলেন এক চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা। ১৯৯১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে এক কনসার্টে অংশ নেয় ডিফরেন্ট টাচ। বৃষ্টিকে উপজীব্য করে লেখা ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি শুরুর কয়েক মুহূর্ত পরই সত্যি সত্যি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। খোলা জায়গা হওয়ার কারণে সেদিনের মতো কনসার্ট বন্ধ হয়ে গেল।
মজার ব্যাপার হলো, পরের বছর একই জায়গায় আরেকটি কনসার্টে যখনই ডিফরেন্ট টাচ ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গাওয়া শুরু করল, তখন আবার বৃষ্টি শুরু হলো। যেন গানের সঙ্গে প্রকৃতির এক অলৌকিক যোগসূত্র!
গানের কথা যা আমাদের ভিজিয়ে দেয়। সেই কথা আর সুর ছিল আশরাফ বাবুর। পুরো গানটি হচ্ছে-
শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে
অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে
কবিতার বই সবে খুলেছি
হিমেল হাওয়ায় মন ভিজেছে
জানালার পাশে চাপা মাধবী
বাগানবিলাসী হেনা দুলেছে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে
মেঘেদের যুদ্ধ শুনেছি
সিক্ত আকাশ কেঁদে চলেছে
জমেছে হাঁসের জলকেলি
পথিকের পায়ে হাঁটা থেমেছে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে
নব্বই দশকের রোমান্টিক গানগুলোর অন্যতম এই গানটি আজও সমান জনপ্রিয়। বৃষ্টি এলেই শ্রোতাদের প্রথম পছন্দগুলোর একটি এটি। ডিফরেন্ট টাচের প্রধান ভোকাল মেজবাহ রহমানের কণ্ঠে গানটি যেমন শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়েছে, তেমনি এর সহজ-সরল কথাগুলোও যেন প্রতিটি বর্ষার দিনে নতুন অর্থ পায়।
প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও গানটির আবেদন ম্লান হয়নি। এটি এখনও প্রেম, মন খারাপ আর বৃষ্টির এক অনন্য মেলবন্ধন- যা বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে চিরন্তন হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন