ভারত থেকে আম, চাল ও মসলা আমদানিতে বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ির ফলে বিশ্ববাজারে দেশটির কৃষিপণ্য রপ্তানি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মান নিয়ন্ত্রণ, জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি, পরীক্ষাগারের ঘাটতি এবং পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ বা ট্রেসেবিলিটির অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রায় দুই দশক পর জাপানের বাজারে ভারতীয় আম আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি চীন চাল রপ্তানিতে এবং হংকং ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মসলা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
গত মার্চে জাপানি কোয়ারেন্টিন পরিদর্শকদের সফরের পর আম জীবাণুমুক্তকরণ, পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ৩১ মার্চ জাপানের ইয়োকোহামা কর্তৃপক্ষ উদ্ভিদ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানায় যে ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা পরিদর্শন সনদযুক্ত ভারতীয় আম আর গ্রহণ করা হবে না।
প্রায় দুই দশক আগে ২০০৬ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর এবার জাপানের বাজারে আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বানগানাপল্লি, চৌসা ও মাল্লিকা; এই ছয় জাতের আম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুম্বাইয়ের আম রপ্তানিকারক বিক্রম শাহ জানান, জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে তার ছয় বছর লেগেছিল এবং জাপানের বাজার তাদের পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছিল।
মহরাষ্ট্রের রত্নাগিরির আমচাষি রাজেশ পাতিল জানান, জাপানের বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় বাগান ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলেও শেষ পর্যন্ত রপ্তানি ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আমের পর চাল রপ্তানিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। গত ১৭ এপ্রিল চীন ভারতের তিনটি চাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের আমদানি লাইসেন্স বাতিল করে দাবি করে যে চালের চালানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা জিএমওর উপস্থিতি রয়েছে।
যদিও ভারতীয় রপ্তানিকারক ও সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও এই ঘটনা ভারতের পরীক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। কৃষিবিজ্ঞানী এস কে সিংয়ের মতে, পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষায় ভারতীয় পরীক্ষাগারগুলোর দক্ষতা থাকলেও চীনের জিএমও যাচাইয়ের চাহিদা মেটাতে বড় পরিসরের সক্ষমতার অভাব রয়েছে।
এরই মধ্যে পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশের কারণে হংকং ভারতের কয়েকটি মসলা পণ্য আমদানি স্থগিত করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতীয় জিরার চালানের ৩০ শতাংশ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বসুর মতে, ভারতের কৃষিপণ্য সরবরাহব্যবস্থা খণ্ডিত হওয়ায় কৃষিজমিতে কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল, তার তথ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থায় এগিয়ে গেলেও ভারতে নিবন্ধিত প্যাক হাউজের সংখ্যা মাত্র ২০৭টি এবং কোল্ড স্টোরেজের ঘাটতি রয়েছে।
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে দেশটির অংশ মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। কৃষি অর্থনীতিবিদ অনিল গুপ্তের মতে, ভারত এতদিন বেশি উৎপাদনের ওপর জোর দিলেও উন্নত বাজারে এখন পুরো প্রক্রিয়ায় মান বজায় রাখার প্রমাণও প্রয়োজন।
সরকার পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি জোরদারের উদ্যোগ নিলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এই পরিবর্তন এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
ভারত থেকে আম, চাল ও মসলা আমদানিতে বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ির ফলে বিশ্ববাজারে দেশটির কৃষিপণ্য রপ্তানি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মান নিয়ন্ত্রণ, জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি, পরীক্ষাগারের ঘাটতি এবং পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ বা ট্রেসেবিলিটির অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রায় দুই দশক পর জাপানের বাজারে ভারতীয় আম আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি চীন চাল রপ্তানিতে এবং হংকং ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মসলা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
গত মার্চে জাপানি কোয়ারেন্টিন পরিদর্শকদের সফরের পর আম জীবাণুমুক্তকরণ, পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ৩১ মার্চ জাপানের ইয়োকোহামা কর্তৃপক্ষ উদ্ভিদ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানায় যে ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা পরিদর্শন সনদযুক্ত ভারতীয় আম আর গ্রহণ করা হবে না।
প্রায় দুই দশক আগে ২০০৬ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর এবার জাপানের বাজারে আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বানগানাপল্লি, চৌসা ও মাল্লিকা; এই ছয় জাতের আম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুম্বাইয়ের আম রপ্তানিকারক বিক্রম শাহ জানান, জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে তার ছয় বছর লেগেছিল এবং জাপানের বাজার তাদের পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছিল।
মহরাষ্ট্রের রত্নাগিরির আমচাষি রাজেশ পাতিল জানান, জাপানের বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় বাগান ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলেও শেষ পর্যন্ত রপ্তানি ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আমের পর চাল রপ্তানিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। গত ১৭ এপ্রিল চীন ভারতের তিনটি চাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের আমদানি লাইসেন্স বাতিল করে দাবি করে যে চালের চালানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা জিএমওর উপস্থিতি রয়েছে।
যদিও ভারতীয় রপ্তানিকারক ও সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও এই ঘটনা ভারতের পরীক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। কৃষিবিজ্ঞানী এস কে সিংয়ের মতে, পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষায় ভারতীয় পরীক্ষাগারগুলোর দক্ষতা থাকলেও চীনের জিএমও যাচাইয়ের চাহিদা মেটাতে বড় পরিসরের সক্ষমতার অভাব রয়েছে।
এরই মধ্যে পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশের কারণে হংকং ভারতের কয়েকটি মসলা পণ্য আমদানি স্থগিত করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতীয় জিরার চালানের ৩০ শতাংশ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বসুর মতে, ভারতের কৃষিপণ্য সরবরাহব্যবস্থা খণ্ডিত হওয়ায় কৃষিজমিতে কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল, তার তথ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থায় এগিয়ে গেলেও ভারতে নিবন্ধিত প্যাক হাউজের সংখ্যা মাত্র ২০৭টি এবং কোল্ড স্টোরেজের ঘাটতি রয়েছে।
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে দেশটির অংশ মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। কৃষি অর্থনীতিবিদ অনিল গুপ্তের মতে, ভারত এতদিন বেশি উৎপাদনের ওপর জোর দিলেও উন্নত বাজারে এখন পুরো প্রক্রিয়ায় মান বজায় রাখার প্রমাণও প্রয়োজন।
সরকার পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি জোরদারের উদ্যোগ নিলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এই পরিবর্তন এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন