দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সাড়ে চার হাজারের বেশি মার্কিন সেনা হারানোর পর ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত ও শেষ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির এই অবসানকে ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা নিজেদের একটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছে।
তবে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর থেকে ইরাকের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তথা তেল বিক্রির অর্থের ওপর ওয়াশিংটন যে কার্যকর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা এখনও বিন্দুমাত্র কমেনি। ইরাকের অর্থনীতির মূল লাইফলাইন হলো দেশটির তেল রপ্তানি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় নব্বই শতাংশ অর্থ আসে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল পরিমাণ তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনার পুরো নিয়ন্ত্রণ এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই ন্যস্ত রয়েছে।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতনের পর ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ সংগ্রহ ও পুনর্গঠন কাজের জন্য গঠিত ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক (ডিএফআই) তহবিলটি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থা পরবর্তী প্রতিটি মার্কিন প্রশাসন নিয়মিত নবায়ন করে আসছে। সময়ের বিবর্তনে ডিএফআই তহবিলটি বর্তমানে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি বিশেষ হিসাবে রূপ নিয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডেই পরিচালিত হচ্ছে।
বাগদাদের সরকারি কর্তাব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থের নিরাপত্তা বিধান, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এই ব্যবস্থা কিছু সুফল দিলেও এটি মূলত মার্কিন অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির কাছে ইরাককে পরোক্ষভাবে পরাধীন করে রেখেছে। অতীতে বাগদাদ মার্কিন সেনা তাড়ানোর উদ্যোগ নিলে ওয়াশিংটন এই তহবিলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার হুমকি দিয়ে তা সফলভাবে প্রতিহত করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরাকের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মার্কিন ডলারের সরবরাহ ও লেনদেনের ওপর অতিরিক্ত কড়াকড়ির ফলে দেশটির বাজারে একটি শক্তিশালী সমান্তরাল কালোবাজার গড়ে উঠেছে, যেখানে সরকারি বিনিময় হারের সঙ্গে বাজারের দামের বিরাট ফারাক তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ইরানবিরোধী সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগের নীতি এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরানের চলমান উত্তেজনার মাঝে পড়ে ইরাক এক মারাত্মক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে পড়ে ইরাকি ব্যাংকগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সম্প্রতি বাগদাদ বিতর্কিত 'ডলার নিলাম' ব্যবস্থা বন্ধ করতে বাধ্য হলেও, তেলের অর্থের হিসাব ও ডলার রূপান্তরের ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক ফেডের ভূমিকা অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মাঠের যুদ্ধ থেকে মার্কিন সেনারা বিদায় নিলেও ইরাকের অর্থনীতির ভাগ্যনিয়ন্তা হিসেবে ওয়াশিংটনের অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী আধিপত্য দীর্ঘকাল ধরেই বজায় থাকবে।

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সাড়ে চার হাজারের বেশি মার্কিন সেনা হারানোর পর ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত ও শেষ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির এই অবসানকে ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা নিজেদের একটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছে।
তবে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর থেকে ইরাকের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তথা তেল বিক্রির অর্থের ওপর ওয়াশিংটন যে কার্যকর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা এখনও বিন্দুমাত্র কমেনি। ইরাকের অর্থনীতির মূল লাইফলাইন হলো দেশটির তেল রপ্তানি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় নব্বই শতাংশ অর্থ আসে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল পরিমাণ তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনার পুরো নিয়ন্ত্রণ এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই ন্যস্ত রয়েছে।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতনের পর ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ সংগ্রহ ও পুনর্গঠন কাজের জন্য গঠিত ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক (ডিএফআই) তহবিলটি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থা পরবর্তী প্রতিটি মার্কিন প্রশাসন নিয়মিত নবায়ন করে আসছে। সময়ের বিবর্তনে ডিএফআই তহবিলটি বর্তমানে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি বিশেষ হিসাবে রূপ নিয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডেই পরিচালিত হচ্ছে।
বাগদাদের সরকারি কর্তাব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থের নিরাপত্তা বিধান, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এই ব্যবস্থা কিছু সুফল দিলেও এটি মূলত মার্কিন অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির কাছে ইরাককে পরোক্ষভাবে পরাধীন করে রেখেছে। অতীতে বাগদাদ মার্কিন সেনা তাড়ানোর উদ্যোগ নিলে ওয়াশিংটন এই তহবিলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার হুমকি দিয়ে তা সফলভাবে প্রতিহত করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরাকের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মার্কিন ডলারের সরবরাহ ও লেনদেনের ওপর অতিরিক্ত কড়াকড়ির ফলে দেশটির বাজারে একটি শক্তিশালী সমান্তরাল কালোবাজার গড়ে উঠেছে, যেখানে সরকারি বিনিময় হারের সঙ্গে বাজারের দামের বিরাট ফারাক তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ইরানবিরোধী সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগের নীতি এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরানের চলমান উত্তেজনার মাঝে পড়ে ইরাক এক মারাত্মক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে পড়ে ইরাকি ব্যাংকগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সম্প্রতি বাগদাদ বিতর্কিত 'ডলার নিলাম' ব্যবস্থা বন্ধ করতে বাধ্য হলেও, তেলের অর্থের হিসাব ও ডলার রূপান্তরের ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক ফেডের ভূমিকা অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মাঠের যুদ্ধ থেকে মার্কিন সেনারা বিদায় নিলেও ইরাকের অর্থনীতির ভাগ্যনিয়ন্তা হিসেবে ওয়াশিংটনের অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী আধিপত্য দীর্ঘকাল ধরেই বজায় থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন