আধুনিক স্থাপত্য আর নগরায়ণের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার আদি নিদর্শন ধানের গোলা। সাতক্ষীরা জেলায় একসময় কৃষকের সচ্ছলতা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই গোলা এখন বিলুপ্তির পথে। কয়েক দশক আগেও গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারে ধান মজুতের জন্য গোলার ব্যবহার ছিল। বর্তমানে মাঠে ধান থাকলেও অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে সেই বাঁশের তৈরি গোলাকৃতির গোলা আর চোখে পড়ে না।
একসময় সামাজিক মর্যাদার অন্যতম মাপকাঠি ছিল এই ধানের গোলা। প্রবীণদের মতে, আগে কন্যার বিয়ে ঠিক করার সময় বরপক্ষের বাড়িতে কয়টি ধানের গোলা আছে, তার খোঁজ নিত কনেপক্ষ। এখন সেসব কেবলই রূপকথা।
সাতক্ষীরার প্রবীণ বাসিন্দা রহমতুল্লাহ সরদার ও রহিমা খাতুন জানান, আগে বাঁশের চটা দিয়ে গোলাকার কাঠামো তৈরি করে তাতে কাদা-মাটির প্রলেপ দিয়ে গোলা তৈরি করা হতো। ইঁদুর বা চোর থেকে রক্ষা পেতে গোলার মুখ রাখা হতো অনেকটা উঁচুতে। মাথার ওপর থাকত খড় বা টিনের পিরামিড আকৃতির ছাউনি।
তবে সময়ের বিবর্তনে কারিগরের অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার কারণে এখন আর কৃষকেরা গোলা বানাতে আগ্রহী নন। গোলা তৈরির দক্ষ কারিগরেরাও পেশা বদলে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে বেশির ভাগ কৃষক ধান সংগ্রহ করার পর তা বস্তাভর্তি করে ইটের তৈরি পাকা ঘরে রাখেন অথবা সরাসরি আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে দেন।
এখনও কালের সাক্ষী হয়ে কিছু গোলা টিকে আছে কলারোয়া উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের মোড়ল বাড়িতে। ওই গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘দাদা ও বাবার আমলে ধানের গোলায় ধান রাখা হতো। এখন গোলার প্রচলন নেই বললেই চলে। তবে স্মৃতি হিসেবে আমরা কয়েকটি গোলা এখনও টিকিয়ে রেখেছি। এখন ধান মূলত বস্তায় ভরে গুদামেই রাখা হয়।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আধুনিক গুদাম ঘর ও প্লাস্টিক বস্তার সহজলভ্যতায় গোলা ঘরের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল কৃষিব্যবস্থায় ধানের গোলা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে শুধুই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
আপনার মতামত লিখুন