সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। শেষ মুহূর্তের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সোনালি ফসল হারিয়ে এখন দিশেহারা জেলার হাজারো কৃষক। সারা বছরের খোরাকি তো গেছেই, সঙ্গে নষ্ট হয়েছে গবাদিপশুর খাদ্য খড়ও। সব হারিয়ে কৃষকদের সামনে এখন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভাব আর দুশ্চিন্তা।
এমন পরিস্থিতিতে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ৩ মাস মেয়াদি মানবিক সহায়তার ঘোষণা দেন। এরপরই জেলাজুড়ে শুরু হয় তালিকা প্রণয়নের কাজ। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত জেলায় মোট ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এই তালিকা ঘিরেই এখন উঠেছে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির নানা অভিযোগ।
হাওরপাড়ের কৃষকদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার সুযোগে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও অকৃষকদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। ১৩৭টি হাওরের মধ্যে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও যারা শেষে আবাদ করেছিলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী কৃষকদের ৩ মাসব্যাপী সহায়তা দেওয়া হবে। বেশি ক্ষতিগ্রস্তরা পাবেন ৭,৫০০ টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা ৫,০০০ এবং কম ক্ষতিগ্রস্তরা ২,৫০০ টাকা। এছাড়া জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।
জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের কৃষক মদরিছ আলী আক্ষেপ করে বলেন, “আমার জমির ধান পানির নিচে। এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। অথচ কেউ আমার খবর নিতে আসেনি। আমার ছেলে অনেক চেষ্টা করেও তালিকায় নাম ওঠাতে পারেনি। শুনছি তালিকায় অনেক অকৃষকের নাম উঠেছে।”
একই অভিযোগ শান্তিগঞ্জ উপজেলার শহীদনুর আহমেদের। তিনি বলেন, “তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। যাদের জমি নেই, তাদের নাম তালিকায় এসেছে। অথচ অনেক প্রকৃত কৃষক বাদ পড়েছেন।” তাহিরপুরের কৃষক মশিউর রহমানও জমির ধান হারিয়ে তালিকায় নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক নেতা জানান, তালিকায় প্রায় ৩০ শতাংশ নাম নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের দাবি, তারা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, “তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের আগামী মৌসুমে বীজ ও সার সহায়তাও দেওয়া হবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জানান, যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অকৃষকের নাম পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে তা বাদ দেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল ও সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল উভয়েই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলেন, কোনো অকৃষক বা স্বজনপ্রীতির কারণে যেন সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। শেষ মুহূর্তের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সোনালি ফসল হারিয়ে এখন দিশেহারা জেলার হাজারো কৃষক। সারা বছরের খোরাকি তো গেছেই, সঙ্গে নষ্ট হয়েছে গবাদিপশুর খাদ্য খড়ও। সব হারিয়ে কৃষকদের সামনে এখন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভাব আর দুশ্চিন্তা।
এমন পরিস্থিতিতে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ৩ মাস মেয়াদি মানবিক সহায়তার ঘোষণা দেন। এরপরই জেলাজুড়ে শুরু হয় তালিকা প্রণয়নের কাজ। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত জেলায় মোট ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এই তালিকা ঘিরেই এখন উঠেছে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির নানা অভিযোগ।
হাওরপাড়ের কৃষকদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার সুযোগে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও অকৃষকদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। ১৩৭টি হাওরের মধ্যে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও যারা শেষে আবাদ করেছিলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী কৃষকদের ৩ মাসব্যাপী সহায়তা দেওয়া হবে। বেশি ক্ষতিগ্রস্তরা পাবেন ৭,৫০০ টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা ৫,০০০ এবং কম ক্ষতিগ্রস্তরা ২,৫০০ টাকা। এছাড়া জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।
জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের কৃষক মদরিছ আলী আক্ষেপ করে বলেন, “আমার জমির ধান পানির নিচে। এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। অথচ কেউ আমার খবর নিতে আসেনি। আমার ছেলে অনেক চেষ্টা করেও তালিকায় নাম ওঠাতে পারেনি। শুনছি তালিকায় অনেক অকৃষকের নাম উঠেছে।”
একই অভিযোগ শান্তিগঞ্জ উপজেলার শহীদনুর আহমেদের। তিনি বলেন, “তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। যাদের জমি নেই, তাদের নাম তালিকায় এসেছে। অথচ অনেক প্রকৃত কৃষক বাদ পড়েছেন।” তাহিরপুরের কৃষক মশিউর রহমানও জমির ধান হারিয়ে তালিকায় নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক নেতা জানান, তালিকায় প্রায় ৩০ শতাংশ নাম নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের দাবি, তারা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, “তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের আগামী মৌসুমে বীজ ও সার সহায়তাও দেওয়া হবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জানান, যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অকৃষকের নাম পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে তা বাদ দেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল ও সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল উভয়েই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলেন, কোনো অকৃষক বা স্বজনপ্রীতির কারণে যেন সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে।

আপনার মতামত লিখুন