সংবাদ

ম্যারাথন রেকর্ডের বিশ্বমঞ্চ: প্যাটেনড থেকে এমবাপ্পে হয়ে এবার মেসির ম্যাজিক


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

ম্যারাথন রেকর্ডের বিশ্বমঞ্চ: প্যাটেনড থেকে এমবাপ্পে হয়ে এবার মেসির ম্যাজিক

ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে হ্যাটট্রিক সবসময়ই এক অনন্য ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়। ২০২৬ সালের ১৭ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেই সোনালী পাতায় নিজের নাম নতুন করে লিখিয়েছেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে আলবিসেলেস্তেদের এই মহানায়ক তুলে নিয়েছেন তার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক।

এই রাজকীয় কীর্তির পর আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের সেরা ফুটবলার মেসি তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "বিশ্বকাপের মঞ্চে হ্যাটট্রিক করা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই স্বপ্নের মতো। এটি আমার প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক, যা দলের জয়ে ভূমিকা রাখতে পেরেছে দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে আমাদের জন্য ম্যাচটি জেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।"

একই সাথে এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে এসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের বয়োজেষ্ঠ্য হ্যাটট্রিকধারী হওয়ার নতুন কীর্তিও গড়লেন মেসি।

​বিশ্বকাপ ফুটবলের এই অনন্য রেকর্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে। ১৯৩০ সালে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনড ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকটি করেছিলেন।

ফিফার নথিপত্র অনুযায়ী সেই ঐতিহাসিক কীর্তির নায়ক প্যাটেনড পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রথম হ্যাটট্রিককারী হওয়াটা দারুণ গর্বের। গোলগুলো যখন একের পর এক জালে জড়াচ্ছিল, আমি শুধু দলের জয় নিশ্চিত করার কথাই ভাবছিলাম।"

সেই আসর থেকে শুরু হওয়া ধারাটি আজকের মেসি পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তবে পুরো ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ ছাড়া প্রতিটি আসরেই অন্তত একটি করে হ্যাটট্রিকের দেখা পেয়েছে ফুটবল বিশ্ব, যার মধ্যে ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৮টি হ্যাটট্রিক হয়েছিল।

​নকআউট বা গ্রুপ পর্ব ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো স্নায়ুচাপের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার অবিশ্বাস্য কীর্তি রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের মাত্র দুই জন ফুটবলারের। ১৯৬৬ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট প্রথম এই গৌরব অর্জন করেন। ফাইনালের সেই অবিশ্বাস্য রাত নিয়ে হার্স্ট তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, "ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। যখন শেষ বাঁশি বাজল, আমি বুঝতে পারলাম আমরা শুধু ম্যাচটিই জিতিনি, ফুটবলের ইতিহাসেও নিজেদের জায়গা করে নিয়েছি।"

দীর্ঘ সময় পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার এই অতিমানবীয় কীর্তি স্পর্শ করেন। ফাইনালে পরাজিত হলেও নিজের সেই পারফরম্যান্স নিয়ে এমবাপ্পে পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, "ফাইনালে তিন গোল করেও ট্রফি না পাওয়ার কষ্টটা অনেক বড়। তবে দলের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে পেরে আমি গর্বিত, হ্যাটট্রিকটি সেই লড়াইয়েরই একটি অংশ ছিল।"

​বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পুরো ফুটবল ইতিহাসে মাত্র চার জন খেলোয়াড় বিশ্বকাপে একাধিক হ্যাটট্রিক করার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। তারা হলেন: ১৯৫৪ সালের হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোকসিস, ১৯৫৮ সালের ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন, ১৯৭০ সালের পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার এবং ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা।

এর মধ্যে বাতিস্তুতা একমাত্র ফুটবলার যিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার বিশ্বরেকর্ড নিজের দখলে রেখেছেন। নিজের এই অসামান্য অর্জন নিয়ে বাতিস্তুতা একবার গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, "আর্জেন্টিনার জার্সিতে গোল করাটাই সবসময় স্পেশাল। আর দুটি আলাদা বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করাটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরাড় প্রাপ্তি, যা দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছিল।"

এছাড়া ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে এল সালভাদরের বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র ৭ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের মধ্যে দ্রুততম হ্যাটট্রিক করে ইতিহাস গড়েছিলেন হাঙ্গেরির লাসলো কিস। সব মিলিয়ে মেসির এই সাম্প্রতিকতম ম্যাজিকসহ ফিফা বিশ্বকাপের মহাকাব্যে হ্যাটট্রিকের গল্পগুলো ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬


ম্যারাথন রেকর্ডের বিশ্বমঞ্চ: প্যাটেনড থেকে এমবাপ্পে হয়ে এবার মেসির ম্যাজিক

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে হ্যাটট্রিক সবসময়ই এক অনন্য ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়। ২০২৬ সালের ১৭ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেই সোনালী পাতায় নিজের নাম নতুন করে লিখিয়েছেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে আলবিসেলেস্তেদের এই মহানায়ক তুলে নিয়েছেন তার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক।

এই রাজকীয় কীর্তির পর আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের সেরা ফুটবলার মেসি তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "বিশ্বকাপের মঞ্চে হ্যাটট্রিক করা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই স্বপ্নের মতো। এটি আমার প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক, যা দলের জয়ে ভূমিকা রাখতে পেরেছে দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে আমাদের জন্য ম্যাচটি জেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।"

একই সাথে এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে এসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের বয়োজেষ্ঠ্য হ্যাটট্রিকধারী হওয়ার নতুন কীর্তিও গড়লেন মেসি।

​বিশ্বকাপ ফুটবলের এই অনন্য রেকর্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে। ১৯৩০ সালে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনড ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকটি করেছিলেন।

ফিফার নথিপত্র অনুযায়ী সেই ঐতিহাসিক কীর্তির নায়ক প্যাটেনড পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রথম হ্যাটট্রিককারী হওয়াটা দারুণ গর্বের। গোলগুলো যখন একের পর এক জালে জড়াচ্ছিল, আমি শুধু দলের জয় নিশ্চিত করার কথাই ভাবছিলাম।"

সেই আসর থেকে শুরু হওয়া ধারাটি আজকের মেসি পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তবে পুরো ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ ছাড়া প্রতিটি আসরেই অন্তত একটি করে হ্যাটট্রিকের দেখা পেয়েছে ফুটবল বিশ্ব, যার মধ্যে ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৮টি হ্যাটট্রিক হয়েছিল।

​নকআউট বা গ্রুপ পর্ব ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো স্নায়ুচাপের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার অবিশ্বাস্য কীর্তি রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের মাত্র দুই জন ফুটবলারের। ১৯৬৬ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট প্রথম এই গৌরব অর্জন করেন। ফাইনালের সেই অবিশ্বাস্য রাত নিয়ে হার্স্ট তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, "ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। যখন শেষ বাঁশি বাজল, আমি বুঝতে পারলাম আমরা শুধু ম্যাচটিই জিতিনি, ফুটবলের ইতিহাসেও নিজেদের জায়গা করে নিয়েছি।"

দীর্ঘ সময় পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার এই অতিমানবীয় কীর্তি স্পর্শ করেন। ফাইনালে পরাজিত হলেও নিজের সেই পারফরম্যান্স নিয়ে এমবাপ্পে পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, "ফাইনালে তিন গোল করেও ট্রফি না পাওয়ার কষ্টটা অনেক বড়। তবে দলের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে পেরে আমি গর্বিত, হ্যাটট্রিকটি সেই লড়াইয়েরই একটি অংশ ছিল।"

​বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পুরো ফুটবল ইতিহাসে মাত্র চার জন খেলোয়াড় বিশ্বকাপে একাধিক হ্যাটট্রিক করার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। তারা হলেন: ১৯৫৪ সালের হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোকসিস, ১৯৫৮ সালের ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন, ১৯৭০ সালের পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার এবং ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা।

এর মধ্যে বাতিস্তুতা একমাত্র ফুটবলার যিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার বিশ্বরেকর্ড নিজের দখলে রেখেছেন। নিজের এই অসামান্য অর্জন নিয়ে বাতিস্তুতা একবার গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, "আর্জেন্টিনার জার্সিতে গোল করাটাই সবসময় স্পেশাল। আর দুটি আলাদা বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করাটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরাড় প্রাপ্তি, যা দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছিল।"

এছাড়া ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে এল সালভাদরের বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র ৭ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের মধ্যে দ্রুততম হ্যাটট্রিক করে ইতিহাস গড়েছিলেন হাঙ্গেরির লাসলো কিস। সব মিলিয়ে মেসির এই সাম্প্রতিকতম ম্যাজিকসহ ফিফা বিশ্বকাপের মহাকাব্যে হ্যাটট্রিকের গল্পগুলো ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত