সংবাদ

যার পেছনে ছুটছে ৮০০ কোটি মানুষ


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

যার পেছনে ছুটছে ৮০০ কোটি মানুষ
ছবি : এআই

রিও-র মাঠে যখন নেইমার জাদুকরী ড্রিবল দেয়, বুয়েনস আয়ার্সে যখন ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অফ গড' তখন আলোচিত। লন্ডনের পাবগুলোতে যখন ম্যানেজাররা চিৎকার করে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিয়ে- ঠিক সেই মুহূর্তের কেন্দ্রে কিন্তু একটি বস্তু। গোল। সাদা-কালো, এখন আরও রঙিন)।চামড়া বা সিনথেটিক। যাকে আমরা বলি ফুটবল।

ফুটবল বল যেন খেলার অদৃশ্য নায়ক। আর এই নায়কের গল্প কিন্তু খেলাটার চেয়েও পুরোনো। অনেক বেশি জটিল। অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।

ইতিহাস

আধুনিক ফুটবলের জন্মেরও ২০০০ বছর আগে, চীন, গ্রিস, রোম, মায়ান সভ্যতায় নানা রকম ‘বল-খেলা’ ছিল। কিন্তু বলটা কী দিয়ে বানাতেন?খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ বছর আগে চীনা সৈন্যরা পশুর চামড়ায় ভরা পালক কিংবা চুলের বল দিয়ে ‘তু চ্যু’ খেলত। এটা ছিল সামরিক প্রশিক্ষণ। গ্রিকরা একটি লিনেন বা সিল্কের থলির মধ্যে বালি বা চুল ভরে বল তৈরি করত। মায়ান সভ্যতায় ৩০০০ বছর আগেই রাবার গাছের রস জ্বালিয়ে তৈরি করেছিল লাফানো বল। যা ধর্মীয় আচারেরও অংশ ছিল।

ইউরোপের মধ্যযুগে এসে দৃশ্য বদলায়। গ্রামের মাঠে শত শত মানুষ অংশ নিত 'ফোক ফুটবলে'। তখন বল ছিল শূকর বা বলদের মূত্রাশয়, ফুলিয়ে রশি দিয়ে বাঁধা। স্থিতিস্থাপকতা ছিল শূন্য, পায়ে লাথি মারলে উড়ত না। বরং স্লাইড করত মাটি বেয়ে। আর পানিতে পড়লেই সেটা হয়ে যেত পাথরসম ভারী।

মধ্যযুগে  যখন রাবার এলো, আর বল শুরু করল উড়তে।ফুটবল বলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্টটা কিন্তু খেলার মাঠে নয়। ঘটেছিল একটি রাসায়নিক পরীক্ষাগারে।

চার্লস গুডইয়ার নামের এক আমেরিকান আবিষ্কারক ১৮৩৮ সালে ‘ভালকানাইজড রাবার’ পেটেন্ট করেন। অর্থাৎ, রাবারের সঙ্গে সালফার মিশিয়ে তা শক্ত, ইলাস্টিক ও আবহাওয়া-সহনশীল করা যায়। পৃথিবী পেল প্রথম ‘ইনফ্লেটেবল’ ফুটবল বল- যার ভেতরে রাবারের ব্লাডার, যেটা বাতাস ভরে ফোলানো যায়, সেটা সমান বাউন্স করে এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কিন্তু ১৮০০ সালের শেষ দিকের বলগুলো দেখতে ছিল আজকের থেকে একদম আলাদা। সেগুলোতে চামড়ার ১৮ টুকরো প্যানেল থাকত, হাতে সেলাই করা, মোটা চামড়ার লেস দিয়ে জোড়া লাগানো। মাথায় হেডার মারলেই তালু ফেটে রক্ত বেরোত। বৃষ্টিতে তা ভিজে এত ভারী হতো যে গোলরক্ষক তা ধরে ফেলে দিতেন।

প্রযুক্তির ছোঁয়া

১৯৬২ সালে ডেনমার্কের ডিজাইনার এইগিল নিলসেন নীলনকশা বদলে দেন। তিনি তৈরি করেন ৩২টি প্যানেলের বল- ২০টি ষড়ভুজ এবং ১২টি পঞ্চভুজের সমন্বয়। এটি ছিল ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির এক অনবদ্য ব্যবহার- ট্রাঙ্কেটেড আইকোসাহেড্রন।

এই জ্যামিতিক ডিজাইনটির সৌন্দর্য হলো, এটি বলটিকে যতটা সম্ভব গোলাকার এবং সমান করে তোলে। আর যে কোনো দিক থেকে পড়লে তার আচরণ প্রায় একই রকম হয়। এটি নিছক ডিজাইন নয়, এটি গণিত, পদার্থবিদ্যা ও বায়োমেকানিক্সের মেলবন্ধন।

বাণিজ্যের গল্প

বিশ্বকাপের ইতিহাসে বল নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে ১৯৩০ সালের ফাইনালে। উরুগুয়ে ভার্সেস আর্জেন্টিনা। দুই দলই নিজেদের তৈরি বল দিয়ে খেলতে চায়। রেফারি সমাধান দেন অদ্ভুত- প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল, দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল। আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে ২-১ এগিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের কাছে ৪-২ তে হারে।

ইতিহাস বলে, উরুগুয়ের বলটা ছিল বড় ও ভারী, আর আর্জেন্টিনার বলটা ছিল ছোট ও ফুরফুরে- যা আর্জেন্টাইন স্পিডের পক্ষে বেশি সহায়ক ছিল। কিন্তু ফাইনাল যেহেতু উরুগুয়ের মাটিতে, সুবিধা পেয়ে যায় উরুগুয়ে!

এরপর ১৯৭০ বিশ্বকাপে অ্যাডিডাস টেলস্টার এলো। সাদা রঙের ওপর কালো পেন্টাগন। ডিজাইনটা শুধু নান্দনিক ছিল না- ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট টেলিভিশনের যুগে এই প্যাটার্ন বলটিকে পর্দায় স্পষ্টভাবে দেখা যেত।

প্রাচীন ফুটবল

ফুটবলে মিথ

ফুটবল বলকে কোনো কোনো দেশে ‘পবিত্র’ জ্ঞান করা হয়। ব্রাজিলে বিশ্বাস, কোনো বল যদি কোনো ম্যাচে গোল হয়, সেটা আবার একই ম্যাচে ব্যবহার করা উচিত নয়— নইলে ‘ভাগ্য বদলে যায়’।ইতালির সিরি এ-তে আছেন রেফারিরা যারা নির্দিষ্ট বল বাছাই করেন, কারণ কোনো বল 'হারানো দলের দুর্ভাগ্য' বলে বিবেচিত হয়।

আফ্রিকার কোনো কোনো উপজাতিতে বিশ্বাস, ফুটবল বলের ভেতর আত্মা বাস করে, তাই বল মাটিতে পড়লে তাকে 'সম্মান' দিয়ে ওঠাতে হয়—পা দিয়ে নয়, হাত দিয়ে।

ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে, বিশ্বকাপের প্রতিটি অফিসিয়াল বলের নামকরণ হয় আলাদাভাবে।টেলস্টার, ট্যাঙ্গো, এজুভা, ফেভারনিকা, +টিমগিস্ট, ব্রাজুকা—প্রতিটি নামের পেছনে আছে আয়োজক দেশের সংস্কৃতি ও ভাষা। ব্রাজিলের 'ব্রাজুকা' মানে 'ব্রাজিলিয়ান', যা ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানায়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


যার পেছনে ছুটছে ৮০০ কোটি মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

featured Image

রিও-র মাঠে যখন নেইমার জাদুকরী ড্রিবল দেয়, বুয়েনস আয়ার্সে যখন ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অফ গড' তখন আলোচিত। লন্ডনের পাবগুলোতে যখন ম্যানেজাররা চিৎকার করে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিয়ে- ঠিক সেই মুহূর্তের কেন্দ্রে কিন্তু একটি বস্তু। গোল। সাদা-কালো, এখন আরও রঙিন)।চামড়া বা সিনথেটিক। যাকে আমরা বলি ফুটবল।

ফুটবল বল যেন খেলার অদৃশ্য নায়ক। আর এই নায়কের গল্প কিন্তু খেলাটার চেয়েও পুরোনো। অনেক বেশি জটিল। অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।

ইতিহাস

আধুনিক ফুটবলের জন্মেরও ২০০০ বছর আগে, চীন, গ্রিস, রোম, মায়ান সভ্যতায় নানা রকম ‘বল-খেলা’ ছিল। কিন্তু বলটা কী দিয়ে বানাতেন?খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ বছর আগে চীনা সৈন্যরা পশুর চামড়ায় ভরা পালক কিংবা চুলের বল দিয়ে ‘তু চ্যু’ খেলত। এটা ছিল সামরিক প্রশিক্ষণ। গ্রিকরা একটি লিনেন বা সিল্কের থলির মধ্যে বালি বা চুল ভরে বল তৈরি করত। মায়ান সভ্যতায় ৩০০০ বছর আগেই রাবার গাছের রস জ্বালিয়ে তৈরি করেছিল লাফানো বল। যা ধর্মীয় আচারেরও অংশ ছিল।

ইউরোপের মধ্যযুগে এসে দৃশ্য বদলায়। গ্রামের মাঠে শত শত মানুষ অংশ নিত 'ফোক ফুটবলে'। তখন বল ছিল শূকর বা বলদের মূত্রাশয়, ফুলিয়ে রশি দিয়ে বাঁধা। স্থিতিস্থাপকতা ছিল শূন্য, পায়ে লাথি মারলে উড়ত না। বরং স্লাইড করত মাটি বেয়ে। আর পানিতে পড়লেই সেটা হয়ে যেত পাথরসম ভারী।

মধ্যযুগে  যখন রাবার এলো, আর বল শুরু করল উড়তে।ফুটবল বলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্টটা কিন্তু খেলার মাঠে নয়। ঘটেছিল একটি রাসায়নিক পরীক্ষাগারে।

চার্লস গুডইয়ার নামের এক আমেরিকান আবিষ্কারক ১৮৩৮ সালে ‘ভালকানাইজড রাবার’ পেটেন্ট করেন। অর্থাৎ, রাবারের সঙ্গে সালফার মিশিয়ে তা শক্ত, ইলাস্টিক ও আবহাওয়া-সহনশীল করা যায়। পৃথিবী পেল প্রথম ‘ইনফ্লেটেবল’ ফুটবল বল- যার ভেতরে রাবারের ব্লাডার, যেটা বাতাস ভরে ফোলানো যায়, সেটা সমান বাউন্স করে এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কিন্তু ১৮০০ সালের শেষ দিকের বলগুলো দেখতে ছিল আজকের থেকে একদম আলাদা। সেগুলোতে চামড়ার ১৮ টুকরো প্যানেল থাকত, হাতে সেলাই করা, মোটা চামড়ার লেস দিয়ে জোড়া লাগানো। মাথায় হেডার মারলেই তালু ফেটে রক্ত বেরোত। বৃষ্টিতে তা ভিজে এত ভারী হতো যে গোলরক্ষক তা ধরে ফেলে দিতেন।

প্রযুক্তির ছোঁয়া

১৯৬২ সালে ডেনমার্কের ডিজাইনার এইগিল নিলসেন নীলনকশা বদলে দেন। তিনি তৈরি করেন ৩২টি প্যানেলের বল- ২০টি ষড়ভুজ এবং ১২টি পঞ্চভুজের সমন্বয়। এটি ছিল ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির এক অনবদ্য ব্যবহার- ট্রাঙ্কেটেড আইকোসাহেড্রন।

এই জ্যামিতিক ডিজাইনটির সৌন্দর্য হলো, এটি বলটিকে যতটা সম্ভব গোলাকার এবং সমান করে তোলে। আর যে কোনো দিক থেকে পড়লে তার আচরণ প্রায় একই রকম হয়। এটি নিছক ডিজাইন নয়, এটি গণিত, পদার্থবিদ্যা ও বায়োমেকানিক্সের মেলবন্ধন।

বাণিজ্যের গল্প

বিশ্বকাপের ইতিহাসে বল নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে ১৯৩০ সালের ফাইনালে। উরুগুয়ে ভার্সেস আর্জেন্টিনা। দুই দলই নিজেদের তৈরি বল দিয়ে খেলতে চায়। রেফারি সমাধান দেন অদ্ভুত- প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল, দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল। আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে ২-১ এগিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের কাছে ৪-২ তে হারে।

ইতিহাস বলে, উরুগুয়ের বলটা ছিল বড় ও ভারী, আর আর্জেন্টিনার বলটা ছিল ছোট ও ফুরফুরে- যা আর্জেন্টাইন স্পিডের পক্ষে বেশি সহায়ক ছিল। কিন্তু ফাইনাল যেহেতু উরুগুয়ের মাটিতে, সুবিধা পেয়ে যায় উরুগুয়ে!

এরপর ১৯৭০ বিশ্বকাপে অ্যাডিডাস টেলস্টার এলো। সাদা রঙের ওপর কালো পেন্টাগন। ডিজাইনটা শুধু নান্দনিক ছিল না- ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট টেলিভিশনের যুগে এই প্যাটার্ন বলটিকে পর্দায় স্পষ্টভাবে দেখা যেত।

প্রাচীন ফুটবল

ফুটবলে মিথ

ফুটবল বলকে কোনো কোনো দেশে ‘পবিত্র’ জ্ঞান করা হয়। ব্রাজিলে বিশ্বাস, কোনো বল যদি কোনো ম্যাচে গোল হয়, সেটা আবার একই ম্যাচে ব্যবহার করা উচিত নয়— নইলে ‘ভাগ্য বদলে যায়’।ইতালির সিরি এ-তে আছেন রেফারিরা যারা নির্দিষ্ট বল বাছাই করেন, কারণ কোনো বল 'হারানো দলের দুর্ভাগ্য' বলে বিবেচিত হয়।

আফ্রিকার কোনো কোনো উপজাতিতে বিশ্বাস, ফুটবল বলের ভেতর আত্মা বাস করে, তাই বল মাটিতে পড়লে তাকে 'সম্মান' দিয়ে ওঠাতে হয়—পা দিয়ে নয়, হাত দিয়ে।

ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে, বিশ্বকাপের প্রতিটি অফিসিয়াল বলের নামকরণ হয় আলাদাভাবে।টেলস্টার, ট্যাঙ্গো, এজুভা, ফেভারনিকা, +টিমগিস্ট, ব্রাজুকা—প্রতিটি নামের পেছনে আছে আয়োজক দেশের সংস্কৃতি ও ভাষা। ব্রাজিলের 'ব্রাজুকা' মানে 'ব্রাজিলিয়ান', যা ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানায়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত