ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের তরুণ মুখ রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—তিন জায়গাতেই একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন, নেহা বোরা তাদের একজন।
বয়স মাত্র ২৯। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। একই সঙ্গে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) জাতীয় সভাপতি। কয়েক মাস আগেও মূলত ছাত্ররাজনীতির পরিসরেই পরিচিত ছিলেন তিনি। এখন তাকে দেখা যাচ্ছে জাতীয় রাজনীতির নানা আলোচিত আন্দোলনের সামনের সারিতে।
শিক্ষা, চাকরি, নিয়োগ পরীক্ষা, তরুণদের ভবিষ্যৎ, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র—বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য সামনে এসেছে। দীর্ঘ অনশন, রাজপথের আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে টানাপোড়েন, দেশজুড়ে ছাত্রদের সংগঠিত করার কর্মসূচি—সব মিলিয়ে নেহা এখন ভারতের নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ।
তবে তার গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, যে পরিবারে তার বেড়ে ওঠা, সেই পরিবার রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সমর্থক। আর নেহা নিজে বেছে নিয়েছেন বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির পথ।
নেহার রাজনীতিতে আসার গল্প সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থেকে শুরু হয়নি। এর পেছনে ছিল নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পথনাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সমাজ, বৈষম্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার পরিচয় আরও গভীর হয়। পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন।
নেহার নিজের বক্তব্যেও রাজনীতিতে আসার পেছনে এই উপলব্ধির কথা এসেছে—সমাজ ও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো যখন মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে, তখন শুধু দর্শক হয়ে থাকা তার কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি।
এই জায়গাটিই তার রাজনৈতিক পরিচয় বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে স্লোগান দেওয়া একজন ছাত্রনেতা নন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ের মতো দৈনন্দিন সমস্যাকে রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা করেন।
নেহার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে তার পারিবারিক রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে বেশ আলোচনা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেহা জানিয়েছেন, তার পরিবার বিজেপির সমর্থক। ফলে তার বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে।তবে বিষয়টি শুধু পরিবার বনাম নেহার রাজনৈতিক মতাদর্শের গল্প নয়। সময়ের সঙ্গে পরিবারের কিছু সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিশেষ করে আন্দোলনের সময় পুলিশের আচরণ দেখার পর তার মায়ের মনোভাব কিছুটা বদলেছিল।
এখানেই নেহার গল্পটি ভারতের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের একটি বড় বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। একই পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক মত আলাদা হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিসর সেই মতপার্থক্যকে আরও দৃশ্যমান করে তুলছে।
নেহা সেই বাস্তবতারই একটি আলোচিত উদাহরণ। নেহার জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি বাড়ানোর সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল ২৩ দিনের অনশন। শিক্ষা ও ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি সামনে রেখে দিল্লির যন্তর মন্তরে তিনি দীর্ঘ সময় অনশন করেন। ২০ জুলাই অনশন শেষ করার পর তার নাম আরও ব্যাপকভাবে সংবাদমাধ্যমে আসে।
একজন ছাত্রনেতার জন্য টানা ২৩ দিন অনশন নিছক শারীরিক পরীক্ষা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক বার্তা, গণমাধ্যমের মনোযোগ এবং আন্দোলনের প্রতি মানুষের আগ্রহ। এই সময় নেহাকে ঘিরে সমর্থনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা সমালোচনাও হয়েছে। তবে সেসবের অনেকটাই ছিল রাজনৈতিক বিরোধিতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি; সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নিশ্চিত বিষয় হলো, অনশনের পর নেহার দৃশ্যমানতা অনেক বেড়ে যায়।কীভাবে ‘জেন-জি’ আইকন
নেহাকে ‘জেন-জি মুখ’ বলা হচ্ছে মূলত তার বয়স, রাজনৈতিক ভাষা এবং তরুণদের ইস্যুতে সক্রিয়তার কারণে। তার বক্তব্যে পুরোনো রাজনৈতিক স্লোগানের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উদ্বেগও জায়গা পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, চাকরি, নিয়োগে বিলম্ব, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন—এসব তাঁর আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে আইসা ‘জেন-জি রাইজিং’ নামে দেশজুড়ে একটি কর্মসূচি শুরু করে। শিক্ষা, বেকারত্ব, প্রবেশিকা পরীক্ষা ও তরুণদের ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজ্যে প্রচার চালানো হয়। এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন নেহা।
এরপর তিনি বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ছাত্র ও তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন। উত্তরপ্রদেশেও ‘জেন-জি মহাজুটান যাত্রা’ কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়। এই ধারাবাহিকতায় তার রাজনৈতিক পরিচয় দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের তরুণ আন্দোলনের মুখে রূপ নিতে শুরু করে।নেহার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটাধিকার ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে অবস্থান। অক্টোবরের শুরুতে ভারতের ভোটার তালিকা পরিবর্তন নিয়ে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে দিল্লিতে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। তাদের মধ্যে নেহাও ছিলেন। ওই আন্দোলনে ভোটার তালিকার সাম্প্রতিক পরিবর্তনের বিরোধিতা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। এর ফলে নেহার রাজনৈতিক ভূমিকার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। তিনি শুধু ক্যাম্পাসের শিক্ষা বা চাকরির দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি; ভোটার তালিকা, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়েও প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।
পুলিশের আটক হওয়ার ঘটনাটিও তাকে আরও বেশি আলোচনায় নিয়ে আসে। দিল্লির ওই ঘটনার পর কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও তাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। সেখানে তিনি বিজেপি ও আরএসএসের রাজনীতির সমালোচনা করেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন।
রাজনীতির নতুন ভাষা
নেহার উত্থান শুধু একজন তরুণ নেতার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এর মধ্য দিয়ে ভারতের বাম ছাত্ররাজনীতির একটি পরিবর্তিত ভাষারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভারতের পুরোনো বাম ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে শ্রেণি, শ্রমিক-কৃষক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত। কিন্তু নতুন প্রজন্মের আন্দোলনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরীক্ষার অনিশ্চয়তা, চাকরির সংকট, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন।
নেহার বক্তব্যে এই বিষয়গুলো একসঙ্গে আসে। এ কারণে তাকে কেবল ‘বামপন্থী ছাত্রনেতা’ হিসেবে দেখলে তার বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার পুরোটা বোঝা যায় না। তিনি এমন এক সময় সামনে এসেছেন, যখন ভারতের তরুণদের মধ্যে চাকরি ও শিক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে।নারীদের নতুন দৃশ্যমানতা
নেহার উত্থানের আরেকটি দিকও চোখে পড়ার মতো—তিনি একজন তরুণ নারী রাজনৈতিক সংগঠক।ভারতের রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি নতুন নয়। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি ও তরুণদের আন্দোলনে সামনের সারির নারী নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা এখনও পুরুষদের তুলনায় কম। নেহা সেই জায়গায় নিজের উপস্থিতি তৈরি করেছেন রাজপথের আন্দোলন, অনশন, জনসভা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
আগস্টে দ্য গার্ডিয়ান তাকে ভারতের পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনরত তরুণ নারীদের নতুন প্রজন্মের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। সেখানে নেহার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—নিজেদের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে দূরে সরে থাকলে সেই বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়। এই অবস্থানই হয়তো তার প্রজন্মের রাজনৈতিক মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
পুলিশের হেনস্তার শিকার নেহা বোরা
সব পরিচয় একসঙ্গে রাখলে নেহাকে বোঝার ছবিটি এমন—তিনি ২৯ বছরের একজন গবেষক, থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্ররাজনীতিতে আসা একজন সংগঠক, আইসার জাতীয় সভাপতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের তরুণ আন্দোলনের দৃশ্যমান মুখ।
তার রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্টভাবে বামপন্থী। কিন্তু তার জনপ্রিয়তার বড় অংশ এসেছে এমন কিছু প্রশ্ন থেকে, যেগুলো দলীয় সীমানার বাইরে বহু তরুণকে ভাবায়—পড়াশোনা শেষ করে চাকরি হবে কি না, পরীক্ষার ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ, বিশ্ববিদ্যালয় কতটা স্বাধীন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক এবং ভোট দেওয়ার অধিকার কতটা নিরাপদ।
এই কারণেই নেহার উত্থানকে শুধু বাম ছাত্ররাজনীতির একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো কম দেখা হবে। ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের নতুন ভূমিকা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দ্রুত সংগঠিত হচ্ছে, আবার রাজপথেও নামছে। তারা প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ভাষায় কথা বলছে। নেহা বোরা সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান মুখ।
পরিবারের রাজনৈতিক পছন্দ তাকে বিজেপির কাছাকাছি রাখেনি। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে টেনে নিয়েছে বাম ছাত্ররাজনীতির দিকে। আর রাজপথ তাকে নিয়ে এসেছে জাতীয় আলোচনায়। এখন প্রশ্ন হলো, এই দৃশ্যমানতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।কারণ আন্দোলনের রাজনীতিতে সামনে আসা সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই জায়গা ধরে রাখা কঠিন। নেহার সামনে এখন সেই পরীক্ষাই—জেন-জি আন্দোলনের ক্ষোভকে কতটা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দিতে পারেন তিনি এবং তার সংগঠন। সেখানেই হয়তো বোঝা যাবে, নেহা কেবল ২০২৬ সালের আন্দোলনের একটি পরিচিত মুখ, নাকি ভারতের বদলে যাওয়া তরুণ রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী একটি নাম।

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের তরুণ মুখ রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—তিন জায়গাতেই একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন, নেহা বোরা তাদের একজন।
বয়স মাত্র ২৯। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। একই সঙ্গে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) জাতীয় সভাপতি। কয়েক মাস আগেও মূলত ছাত্ররাজনীতির পরিসরেই পরিচিত ছিলেন তিনি। এখন তাকে দেখা যাচ্ছে জাতীয় রাজনীতির নানা আলোচিত আন্দোলনের সামনের সারিতে।
শিক্ষা, চাকরি, নিয়োগ পরীক্ষা, তরুণদের ভবিষ্যৎ, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র—বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য সামনে এসেছে। দীর্ঘ অনশন, রাজপথের আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে টানাপোড়েন, দেশজুড়ে ছাত্রদের সংগঠিত করার কর্মসূচি—সব মিলিয়ে নেহা এখন ভারতের নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ।
তবে তার গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, যে পরিবারে তার বেড়ে ওঠা, সেই পরিবার রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সমর্থক। আর নেহা নিজে বেছে নিয়েছেন বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির পথ।
নেহার রাজনীতিতে আসার গল্প সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থেকে শুরু হয়নি। এর পেছনে ছিল নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পথনাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সমাজ, বৈষম্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার পরিচয় আরও গভীর হয়। পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন।
নেহার নিজের বক্তব্যেও রাজনীতিতে আসার পেছনে এই উপলব্ধির কথা এসেছে—সমাজ ও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো যখন মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে, তখন শুধু দর্শক হয়ে থাকা তার কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি।
এই জায়গাটিই তার রাজনৈতিক পরিচয় বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে স্লোগান দেওয়া একজন ছাত্রনেতা নন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ের মতো দৈনন্দিন সমস্যাকে রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা করেন।
নেহার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে তার পারিবারিক রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে বেশ আলোচনা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেহা জানিয়েছেন, তার পরিবার বিজেপির সমর্থক। ফলে তার বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে।তবে বিষয়টি শুধু পরিবার বনাম নেহার রাজনৈতিক মতাদর্শের গল্প নয়। সময়ের সঙ্গে পরিবারের কিছু সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিশেষ করে আন্দোলনের সময় পুলিশের আচরণ দেখার পর তার মায়ের মনোভাব কিছুটা বদলেছিল।
এখানেই নেহার গল্পটি ভারতের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের একটি বড় বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। একই পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক মত আলাদা হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিসর সেই মতপার্থক্যকে আরও দৃশ্যমান করে তুলছে।
নেহা সেই বাস্তবতারই একটি আলোচিত উদাহরণ। নেহার জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি বাড়ানোর সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল ২৩ দিনের অনশন। শিক্ষা ও ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি সামনে রেখে দিল্লির যন্তর মন্তরে তিনি দীর্ঘ সময় অনশন করেন। ২০ জুলাই অনশন শেষ করার পর তার নাম আরও ব্যাপকভাবে সংবাদমাধ্যমে আসে।
একজন ছাত্রনেতার জন্য টানা ২৩ দিন অনশন নিছক শারীরিক পরীক্ষা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক বার্তা, গণমাধ্যমের মনোযোগ এবং আন্দোলনের প্রতি মানুষের আগ্রহ। এই সময় নেহাকে ঘিরে সমর্থনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা সমালোচনাও হয়েছে। তবে সেসবের অনেকটাই ছিল রাজনৈতিক বিরোধিতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি; সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নিশ্চিত বিষয় হলো, অনশনের পর নেহার দৃশ্যমানতা অনেক বেড়ে যায়।কীভাবে ‘জেন-জি’ আইকন
নেহাকে ‘জেন-জি মুখ’ বলা হচ্ছে মূলত তার বয়স, রাজনৈতিক ভাষা এবং তরুণদের ইস্যুতে সক্রিয়তার কারণে। তার বক্তব্যে পুরোনো রাজনৈতিক স্লোগানের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উদ্বেগও জায়গা পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, চাকরি, নিয়োগে বিলম্ব, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন—এসব তাঁর আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে আইসা ‘জেন-জি রাইজিং’ নামে দেশজুড়ে একটি কর্মসূচি শুরু করে। শিক্ষা, বেকারত্ব, প্রবেশিকা পরীক্ষা ও তরুণদের ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজ্যে প্রচার চালানো হয়। এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন নেহা।
এরপর তিনি বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ছাত্র ও তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন। উত্তরপ্রদেশেও ‘জেন-জি মহাজুটান যাত্রা’ কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়। এই ধারাবাহিকতায় তার রাজনৈতিক পরিচয় দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের তরুণ আন্দোলনের মুখে রূপ নিতে শুরু করে।নেহার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটাধিকার ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে অবস্থান। অক্টোবরের শুরুতে ভারতের ভোটার তালিকা পরিবর্তন নিয়ে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে দিল্লিতে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। তাদের মধ্যে নেহাও ছিলেন। ওই আন্দোলনে ভোটার তালিকার সাম্প্রতিক পরিবর্তনের বিরোধিতা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। এর ফলে নেহার রাজনৈতিক ভূমিকার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। তিনি শুধু ক্যাম্পাসের শিক্ষা বা চাকরির দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি; ভোটার তালিকা, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়েও প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।
পুলিশের আটক হওয়ার ঘটনাটিও তাকে আরও বেশি আলোচনায় নিয়ে আসে। দিল্লির ওই ঘটনার পর কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও তাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। সেখানে তিনি বিজেপি ও আরএসএসের রাজনীতির সমালোচনা করেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন।
রাজনীতির নতুন ভাষা
নেহার উত্থান শুধু একজন তরুণ নেতার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এর মধ্য দিয়ে ভারতের বাম ছাত্ররাজনীতির একটি পরিবর্তিত ভাষারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভারতের পুরোনো বাম ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে শ্রেণি, শ্রমিক-কৃষক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত। কিন্তু নতুন প্রজন্মের আন্দোলনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরীক্ষার অনিশ্চয়তা, চাকরির সংকট, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন।
নেহার বক্তব্যে এই বিষয়গুলো একসঙ্গে আসে। এ কারণে তাকে কেবল ‘বামপন্থী ছাত্রনেতা’ হিসেবে দেখলে তার বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার পুরোটা বোঝা যায় না। তিনি এমন এক সময় সামনে এসেছেন, যখন ভারতের তরুণদের মধ্যে চাকরি ও শিক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে।নারীদের নতুন দৃশ্যমানতা
নেহার উত্থানের আরেকটি দিকও চোখে পড়ার মতো—তিনি একজন তরুণ নারী রাজনৈতিক সংগঠক।ভারতের রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি নতুন নয়। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি ও তরুণদের আন্দোলনে সামনের সারির নারী নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা এখনও পুরুষদের তুলনায় কম। নেহা সেই জায়গায় নিজের উপস্থিতি তৈরি করেছেন রাজপথের আন্দোলন, অনশন, জনসভা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
আগস্টে দ্য গার্ডিয়ান তাকে ভারতের পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনরত তরুণ নারীদের নতুন প্রজন্মের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। সেখানে নেহার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—নিজেদের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে দূরে সরে থাকলে সেই বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়। এই অবস্থানই হয়তো তার প্রজন্মের রাজনৈতিক মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
পুলিশের হেনস্তার শিকার নেহা বোরা
সব পরিচয় একসঙ্গে রাখলে নেহাকে বোঝার ছবিটি এমন—তিনি ২৯ বছরের একজন গবেষক, থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্ররাজনীতিতে আসা একজন সংগঠক, আইসার জাতীয় সভাপতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের তরুণ আন্দোলনের দৃশ্যমান মুখ।
তার রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্টভাবে বামপন্থী। কিন্তু তার জনপ্রিয়তার বড় অংশ এসেছে এমন কিছু প্রশ্ন থেকে, যেগুলো দলীয় সীমানার বাইরে বহু তরুণকে ভাবায়—পড়াশোনা শেষ করে চাকরি হবে কি না, পরীক্ষার ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ, বিশ্ববিদ্যালয় কতটা স্বাধীন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক এবং ভোট দেওয়ার অধিকার কতটা নিরাপদ।
এই কারণেই নেহার উত্থানকে শুধু বাম ছাত্ররাজনীতির একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো কম দেখা হবে। ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের নতুন ভূমিকা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দ্রুত সংগঠিত হচ্ছে, আবার রাজপথেও নামছে। তারা প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ভাষায় কথা বলছে। নেহা বোরা সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান মুখ।
পরিবারের রাজনৈতিক পছন্দ তাকে বিজেপির কাছাকাছি রাখেনি। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে টেনে নিয়েছে বাম ছাত্ররাজনীতির দিকে। আর রাজপথ তাকে নিয়ে এসেছে জাতীয় আলোচনায়। এখন প্রশ্ন হলো, এই দৃশ্যমানতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।কারণ আন্দোলনের রাজনীতিতে সামনে আসা সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই জায়গা ধরে রাখা কঠিন। নেহার সামনে এখন সেই পরীক্ষাই—জেন-জি আন্দোলনের ক্ষোভকে কতটা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দিতে পারেন তিনি এবং তার সংগঠন। সেখানেই হয়তো বোঝা যাবে, নেহা কেবল ২০২৬ সালের আন্দোলনের একটি পরিচিত মুখ, নাকি ভারতের বদলে যাওয়া তরুণ রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী একটি নাম।

আপনার মতামত লিখুন